একটি মহত্তম সংখ্যার সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন: ডেভিড বার্গম্যান (পর্ব- ১)

যে কোন সংঘাতে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা খুঁজে বের করা অত্যন্ত দূরুহ ব্যাপার। বাংলাদেশের রাজনীতির পক্ষপাতমূলক চরিত্রের কারণে এই বাস্তব সমস্যাটি আরো তীব্র হয়েছে।

১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ আদালত ঢাকা ভিত্তিক ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিট বার্গম্যানের বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগসহ ১৯৭১ সালের যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলায়
আদালত অবমাননার অভিযোগে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই লেখাটিতে মি. বার্গম্যান ব্যাখা করেছেন কেন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবিগণ এই সংখ্যাটির সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার রাখেন।

Dhaka Based British Journalist David Bergman

Dhaka Based British Journalist David Bergman

বাংলাদেশ সরকার ঘোসিত ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্থানী মিলিটারী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হবার সংখ্যাটি কতোখানি বাস্তব সম্ভত? যদিও যুদ্ধের পর প্রায় চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে, তবুও বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি একটি সংবেদশনশীল প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে। এই সংশয়ের একটা কারণ বাংলাদেশ এই সংখ্যাটি নিয়েই বেড়ে ওঠেছে- সংখ্যাটি স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয় এবং এটি দেশের গল্প-কবিতা-সংস্কৃতিতে মিশে গেছে।

তাই অধিকাংশ মানুষের কাছেই এই সংখ্যার সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাদের গভীর বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করার মতোই ব্যাপার।

দেশটির স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা শেখ মুজিবর রহমান যিনি বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও পিতা, তিনি এই সংখ্যাটি ঘোসণা করেছিলেন। তার ব্যক্তি পরিচয়ের কারণে এই সংখ্যায় বিশ্বাসের গভীরতা আরো এমন হয়েছে।

এই সংখ্যার সঠিকতা নিয়ে প্রশ্নতোলাও কারো কারো কাছে স্বয়ং শেখ মুজিবকে অপমানের শামিল। এটি এমন একটি সংখ্যা যা বাংলাদেশে অনেকের কাছে পূঁজনীয়, বিশেষত তার দল আওয়ামী লীগের সমর্থক ও নেতাদের নিকট।

ত্রিশ লক্ষ সংখ্যাটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধ বিষয়ে একটি গোঁড়া জাতীয়তাবাদী বক্তৃতারই অংশ যা আওয়ামীলীগ সরকারের বিরোধী পক্ষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সাথে মুখোমুখি অবস্থানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেই চলে আসছে। এমনকি ত্রিশ লক্ষ্য সংখ্যাটি নিয়ে কোন সংশয় প্রকাশ করাও অনেক আওয়ামী লীগারের নিকট স্বাধীতনা বিরোধী এবং বিরোধী মনোভাব প্রকাশেরই শামিল।

তাই, বাংলাদেশে যারা ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হওয়ার বিষয়ে সংখাটির সঠিকতা খুঁজতে চান, তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ব্যক্তি আক্রমণের ভয়ে তারা তাদের মাথা নীচু করে রাখেন।

[নোট: ডেভিড বার্গম্যানের এই লেখাটি গত ২৪ এপ্রিল প্রকাশিত হয়েছে দ্যা হিন্দু পত্রিকায়। এটিি একটি বড় লেখা। লেখাটি আমি বাংলায় অনুবাদের চেষ্টা করে কয়েক কিস্তিতে এখানে প্রকাশের দুঃসাহস দেখাবো। আগ্রহীরা মূল লেখাটি এখান থেকে পড়ে নিতে পারেন]

কিনুন অথবা ডট কম থেকে

প্রতিদিনের জীবনের একদিন

রিকশা থেকে নেমে প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়স্ক রিকশাওয়ালা চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাড়া কতো দেবো?

তিনি বললেন, ’আপনে ইনসাফ কইরা দেন।’

বর্ষার এই খামখেয়ালি বৃষ্টিতে ভিজে তিনি রিক্সা চালিয়ে আমাকে শুক্রাবাদ হতে কারওয়ান বাজার মোড় পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। আমি যখন রিক্সায় বসে পলিথিন কাগজের ভেতরে নিজেকে বৃষ্টির ঝাপটা হতে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম, তিনি তখন বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে যানজট এড়িয়ে রিক্সার প্যাডেল ঘুড়িছেন। তার মাথা বা শরীর কোথাওই কোন বৃষ্টি নিবারক রেইনকোট কিংবা পলিথিনের কোন আবরণ ছিল না। রিক্সায় ওঠেই ব্যাপারটা খেয়াল হলো। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, বৃষ্টি থেকে আপনার মাথা ও শরীর ঢাকার কোন ব্যবস্থা করেন নি কেন? উত্তরে তিনি বললেন, ’বৃষ্টিতে আমার কিছু অয় না। আমি বৃষ্টিতে ভিজ্যা পাট কাটছি, ধান কাটছি। আমার কোন সময় কিছু অয় নাই, কোন দিন ওষুধও কিন্যা খাই নাই।’ এইসব খেয়ে খাওয়া মানুষ কষ্ট সহিষ্ণু। তাদের আদতেই রোগ ব্যধিতে আক্রান্ত হলে চলেনা। বৃষ্টিতে তার সাথে আলাপ তেমন 
জমলো না। তবে তিনি জানালেন, তিনি ঢাকায় রিক্সা চালাচ্ছেন প্রায় পঁচিশ ছাব্বিশ বছর ধরে।

বৃষ্টি পড়ছিল তার মাথায়, শরীরে। শুক্রাবাদ হতে কারওয়ান বাজারে সোনার গাঁ প্রান্তে আসতে আসতে আমি যেখানে রিক্সার ভেতরে বসে অর্ধেক ভিজে গেছি, তখন তার আর ভেজার কিছু বাকি ছিল না। আমি রিক্সায় বসে কাঁদাজল এড়িয়ে আরামে আমার গন্তব্যে এসে গিয়েছি। আমার এই আরামে আসার জন্য পঞ্চাশ কি তারও বেশী বয়সী লোকটিকে বৃষ্টিতে ভিজে রিক্সা চালাতে হয়েছে। এই বৃষ্টি ভেজার কারণে লোকটির সর্দি লাগতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা হতে পারে। এমনকি তার কিডনি পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন তাকে রিক্সা চালানো বাদ দিয়ে ঘরে বসে থাকতে হতে পারে। ওষুধ কেনার জন্য টাকা লাগতে পারে। তার ওপর নির্ভরশীর তার পরিবারের সদস্যদের না খেয়ে থাকতে হতে পারে। আমি অনেক কিছুই ভাবছি। আমি জানি এতোসব কিছুর দায়-দায়িত্ব আমি নেবো না, নেওয়ার ক্ষমতাও আমার নেই।

সকাল বেল যখন অফিসের উদ্দেশ্যে বের হই তখন জ্বলজ্বলে রোদ ছিল। বৃষ্টি হতে পারে এটা ঘুর্ণাক্ষরেও মাথায় আসেনি। হাতে করে ছাতাটা নিয়ে আসার প্রয়োজনটা তখন অনুভব করিনি। মিরপুর রোডের টেকনিক্যাল মোড় থেকে আজ জ্যাম শুরু হয়েছে। মানিক মিয়া এভিনিউয়ের আড়ং সিগনাল পর্যন্ত একই রকম জ্যাম। টেকনিক্যাল মোড় থেকে আসাদগেট পার হতেই পঞ্চাশ মিনিট লেগে গেল। হরতালের পরের দিন হিসেবে অবশ্য এটা একটা কাঙ্খিত ব্যাপার। বাস আসাদগেট পর্যন্ত যতক্ষণে পৌঁছালো ততক্ষনে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। শুক্রাবাদ এসে বাস থেকে নেমে পরের বাস ধরার জন্য দাঁড়ালাম একটা গাছের নীচে। বিশ মিনিট পরেও যখন বাস এলো না তখন সিদ্ধান্ত বদলাতে হলো। ভাবলাম আজ রিক্সায়ই যাই। ততোক্ষণে আমি অনেকটাই ভিজে গিয়েছি।

মাসের শেষ। প্রতিমাসের মতোই এ মাসেও আগের মাসে হাতে পাওয়া বেতনের প্রায় সবটাই বিভিন্ন খাতে খরচ হয়ে গেছে। পৃথিবীর সব দেশেই আয়ের সাথে ব্য়য়ের একটা সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশে তা নেই। পকেটে বাস ভাড়া দেওয়ার মতো পয়সা ছাড়া তেমন টাকা পয়সা নেই। ভাড়া কতো দেবো তা নিয়ে একটা দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গেলাম। কতো ভাড়া দেওয়া উচিত? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ’বিশ টেকা দেন।’ সম্ভবত ১৫ টাকা এখানকার স্বাভাবিক রিক্সাভাড়া। কিংবা ২০ টাকাও হতে পারে। ২০ টাকা স্বাভাবিক ভাড়ার পথ বৃষ্টিতে ভিজে পেরোনোর পর ২০ টাকা ভাড়া চাওয়ার মানে লোকটি হাবাগোবা। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মতো চতুর নয়। তার হাতে ২০ টাকার নোটের সাথে আরো একটা দশ টাকার নোট ধরিয়ে দিলাম। আমি জানি এটা কিছুই না। তবুও মনকে মিথ্যে শান্তনা দেওয়া আরকি।

গত সপ্তাহে প্রায় একই রকম পরিস্থিতিতে পড়ে রিক্সায় চড়তে হয়েছিল। বাংলা মোটর মোড় হতে কোন তরুন রিক্সাচালকই আমার গন্তব্য আবুজর গিফারী কলেজে যেতে রাজি হলো না। মগবাজার মোড়ে পৌঁছালাম দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে। তারপর এক পঞ্চাশোর্ধ রিক্সাচালককে পেলাম ‍যিনি আমার গন্তব্যে যেতে রাজি হলেন। তার গাঁয়ে অবশ্য স্কচটেপ দিয়ে জোড়াতালি লাগানো একটা রেইনকোট পড়া ছিল। কেউ হয়তো দয়া করে দান করেছে। তখনো থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছিল। বলা বহুল্য ওই কলেজে ওটাই ছিল আমার প্রথম যাওয়া এবং সেটা বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য। রাস্তা সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল 
না। চালক যতোই এগিয়ে যাচ্ছিলেন, আমি ততোটাই আৎকে ওঠছিলাম। সামান্য বৃষ্টির পানিতে রাস্তা তলিয়ে গেছে। পানির ওপর ভেসে ওঠেছে মনুষ্য বর্জ্য, আবর্জনা। ববহুকষ্টে এসব ঠেলেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। বুঝতে পারলাম কেন অন্যান্য রিক্সা চালকরা এদিকে আসতে চায়নি।

গন্তব্যে গিয়ে রিক্সা চালককে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা ভাড়া কতো দেবো? তিনি পঞ্চাশ টাকা চাইলেন। আমি বিনাবাক্যে তাকে পঞ্চাশ টাকাই দিলাম। ভাড়াটা দিয়ে আমি হয়তো মনে মনে একটু তৃপ্তিই পেলাম। কিন্তু বাস্তবে আমি জানিনা চুলপাকা এই পঞ্চাশ কিংবা ষাটোর্ধ রিক্সাচালকের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কতো। তার সংসার কিভাবে চলে। তিনি তিন বেলা ঠিক মতো খেতে পারেন কিনা। তার পরিবারের মৌলিক চাঁহিদা তার উপার্জনে মেটানো যায় কিনা।

আমি জানিনা আজকের রিক্সা চালকের সংসারে কে কে আছেন। তার আয় তার জন্য যথেষ্ট কিনা। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর একটা কাজে লেগে থাকা মানে তিনি তার জীবনের অনেকটা সময় তার পেশার মধ্যে দিয়ে মানুষকে সেবা দিয়েছেন। যারা তার রিক্সায় চড়েছেন, তারা আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণী। আশির দশকে যিনি উচ্চ মধ্যবিত্ত ছিলেন, কিংবা মধ্যবিত্ত ছিলেন, তাদের অবস্থা নিশ্চয়ই অনেক উন্নতি হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো উচ্চ বিত্ত হয়েছেন। গাড়ি-বাড়ি করেছেন। কিন্তু প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর ধরে একটা পেশায় যে মানুষটি লেগে আছেন, দেশকে সেবা দিয়েছেন, জীবনের সাথে যুদ্ধ করেছেন- তার কোন উন্নতির ব্যবস্থা এই দেশের সমাজ-ব্যবস্থা, রাষ্ট্র করতে পারেনি।

প্রতিদিনই অনেক মানুষকে ঢাকার রাস্তায় ফুটপাতে শুয়ে থাকতে দেখি। দেশে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে। অন্যদিকে সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠছে রাজনৈতিক নেতাদের।

দেশটা কি এজন্যই স্বাধীন হয়েছিল?

মত প্রকাশের স্বাধীতনা ও হুক্কা-হুয়া মিডিয়া

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রায় সবগুলোরই প্রিন্ট সংস্করণ আমি প্রতিদিন সকাল বেলা দেখে থাকি, কাজের অংশ হিসেবে।

পত্রিকাগুলো যে প্রায় সবই এক শেয়ালের রা, তা আমাদের অজানা নয়। এদের মধ্যে কিছু আছে যারা নিজেদেরকে ‘সুশীল’ দাবী করে। দাবী করে তারা সত্য প্রকাশে আপোষহীন। গতকাল সকালের পত্রিকাগুলো দেখে আমার মনে এই কথাটা ঘুরে ফিরে আসছিল যে- সব শেয়ালের এক রা।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি দাবীকারী এইসব পত্রিকার সম্পাদক-মালিক আসলে আচরণে একেকটা প্রভুভক্ত কুকুরের থেকে কোন অংশে কম নয়। প্রভুর পক্ষে মিথ্যাকে সত্য- সত্যকে মিথ্যার করার জন্য কোরাস গাওয়ার সময় শেয়ালের মতোই হুক্কা-হুয়ায় এরা অদ্বিতীয়। আবার সুবিধা নেওয়ার বেলায় এরা খেক শেয়ালের মতোই ধূর্ত। যুগান্তর এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

যে ডেইলি স্টার কিছুদিন আগে কথিত বাঁশের কেল্লার কোন এক স্ক্রিণশট তৈরি করে প্রথম পাতায় চার কলামের নিউজ করলো যে এরা বাংলাদেশ ভেঙ্গে পাকিস্থানের সাথে মিশে যেতে চায়; নয়তো পাকিস্থান-কাশ্মির-বাংলাদেশ মিলে বাংলাস্তান তৈরি করবে! অথচ এই ডেইলি স্টারই আবার কথিত মুক্তমনা ব্লগারদের নামে ধর্মান্ধদের দ্বারা ধর্মবিদ্বেষী ব্লগ তৈরি করে ওই ব্লগারদের হত্যা-ষড়যন্ত্র পরিকল্পনার কল্পকাহিনী লিখলো ইনিয়ে-বিনিয়ে। ডেইলি স্টারের কাছে বাঁশের কেল্লার স্ক্রিনশটের সত্যতা আছে, ওটা ফেইক নয়; ব্লগারদের ধর্মবিদ্বেষী ব্লগ তাদের লেখা, এটার সত্যতা নেই।

অথচ, ছয়/সাত তারিখের ডেইলি স্টার/প্রথম আলো গংদের দেখুন। তারা মানুষকে বুঝালো যে মাদ্রাসার ছেলেটি সারা জীবন কোরআন শরীফ পড়েছে, কোরআনকে অন্তরে ধারণ করেছে, নিজের জীবনের চেয়ে যে গ্রন্থটির মর্যাদা যার কাছে বহুগুণ বেশী, ওযু ছাড়া যে ছেলেটি ওই গ্রন্থটি স্পর্শ করে না- সেই মাদ্রাসার দাড়ি-টুপি ওয়ালা ছেলেটিই আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে কোরআন শরীফ। আর সম্বস্বরে হুক্কা-হুয়া করে গেল সবগুলো একসাথে। এখানে তারা কন্সপিরেসি থিউরি খুজে পায় নি।

যে হেফাযত এ যাবৎ অর্ধ-শতাধিক সমাবেশ করলো শান্তিপূর্ণভাবে, তারাই নাকি সহিংস হয়ে ওঠলো মতিঝিল চত্বরে এসে। মতিঝিলে আগুন-গুলি-ভাংচুরের ঘটনা সবই নাকি ঘটিয়েছে হেফাযতের কর্মীরা। অথচ, এই লোকগুলি কোরআন শরীফ-হাদীস আর শাদা পায়াজামা-পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য খুব কম জিনিশই জীবনে দেখেছে। এদের অন্ততঃ ৯০ শতাংশ ঢাকা শহরেই এসেছে প্রথম। আর তারাই দেখে দেখে বইয়ের দোকানে, অফিসে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এরা এতোটাই দক্ষ। প্রথম আলো গং বললো, আর আমরাও বিশ্বাস করলাম। লীগের গুন্ডারা যে প্রকাশ্যে গুলি চালালো হেফাযতের মিছিলে, তার ছবিও তাদের ক্যামেরায় ওঠলো না, পত্রিকায়ও আসলো না।

রাতের অন্ধকারে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে যে অভিযান চালানো হলো এইসব পত্রিকার কোনটিতেই তার কোন বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট হলো না।

কেন বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে অভিযান চালানো হয়েছিল?
কেন অভিযানের জন্য রাত আড়াটার সময়কে বেছে নেওয়া হলো?
কতোজন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন সেখানে অংশ নিয়েছে?
কতো পরিমান গোলা-বারুদ ব্যবহৃত হয়ছে?
অভিযানে কতোজন নিহত হলো?

এসব নিয়ে এইসব প্রভুভক্তরা কোন প্রশ্ন তোলেনি। তুলবেও না। বরং আজ উল্টো হুক্কা-হুয়া এসেছে সমকালে- “মৃতের সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচার করা হচ্ছে।”

পত্রিকার দলীয় অবস্থান থাকবেই। এই জায়গার বিরোধীদলের অবস্থা খুবই করুণ। তাদের মিডিয়া বলতে কিছু নেই। বিরোধী দলের মুখপাত্র পত্রিকা সবেধন আমার দেশকে আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য একটি পত্রিকাকে হত্যা করার জন্য তার কোটায় প্রাপ্য সরকারি বিজ্ঞাপন ও নিউজ প্রিন্টের বরাদ্ধ বন্ধ করে দেওয়াই যথেষ্ট। আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে সে ব্যবস্থা আগেই নেওয়া হয়েছিল। তারপরও এটি দাম বাড়িয়ে প্রতিকূল পরিবেশে লড়াই করে টিকে ছিল।

শেষ পর্যন্ত তো সম্পাদককে গ্রেফতার করে প্রেসই সিলগালা করে দিলো। তার আগে বন্ধ করা হয়েছে চ্যানেল ওয়ান। বন্ধ করা হয়েছে ভিন্নমতের ব্লগ সোনার বাংলাদেশ। আমার দেশের পর বন্ধ হলো দিগন্ত আর ইসলামিক টিভি। স্পষ্টতই দেশ একটা ডিক্টেটরশিপের ওপর চলছে। আমরা যা শুনতে পাচ্ছি তা সবই একপক্ষের কথা, অন্যপক্ষের বক্তব্য প্রকাশের রাস্তাটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ভিন্নমতের কথা যা শুনতে পাই, তা কেবল ফেসবুক আর ব্লগেই সীমাবদ্ধ। ফেসবুক-ব্লগে মোট জনসংখ্যার খুব কম মানুষেরই অ্যাকসেস আছে। সেখানেও এখন নিয়ন্ত্রণ চলছে। স্বাধীন মত প্রকাশ এখন আর নির্ভয়ের ব্যাপার নয়; যে কেউ ইলিয়াস আলীর মতো গুম হয়ে যেতে পারে যে কোন সময়।

কোন পত্রিকায়ই শতভাগ নিরপেক্ষ সংবাদ দেয় না। বিরোধী দলের মুখপাত্র পত্রিকা সবেধন আমার দেশও সব ক্ষেত্রে সঠিক সংবাদ করতো না। কিন্তু ভিন্নমত থাকলে দুই পক্ষের কথা থেকে পাঠক অন্ততঃ দুটো অবস্থানের মধ্যেকার সত্যটা অনুধাবন করার সুযোগ পায়। সেইটিরই এখন সবচেয়ে বড় অভাব।

সংবাদে পক্ষপাতিত্ব থাকবেই। তারপরও দেশ ও জাতির কাছে দায়বদ্ধতা বলে তো একটা কথা আছে। সেই জায়গায় এইসব হুক্কা-হুয়ারা কতোটুকু যেতে পেরেছে দলীয় প্রভুভক্তিকে ছাপিয়ে?

আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারণার ফাঁদে তরুণরা

আউটসোর্সিংয়ের নামে  প্রতারণা চলছে দেশে। ডিজিটাল প্রতারণা।  ডোল্যান্সার, স্কাইল্যান্সার, বিডিএস ক্লিক সেন্টার- আরো হরেক নাম। কাজ একটাই- তরুণদেরকে কথিত আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা তুলে নেওয়া।

আউট সোর্সিং-এর নামে এই যে হরেকনামের কতগুলো ভূঁইফুর কম্পানি দেশে তরুণদের তথাকথিত আয় করার সুযোগ করে দিচ্ছে তা মূলতঃ আরেকধরনের এমএলএম জাতীয় পিটিসি উৎপাত। পালের গোদা ডোল্যান্সার। গত বছর এদের আবির্ভাব ঘটে। এদের দেখাদেখি স্কাইলান্সার, বিডিএস ক্লিক সেন্টার আরো অনেক নামে এদের বাটপারি শুরু হয়েছে। এদের তথাকথিত আউট সোর্সিং বলতে বুঝায় একাউন্টপ্রতি দিনের মূল্যবান সময়ের ২/৩ ঘন্টা বসে বসে ক্লিক বাজি করা।  ১০০ ক্লিকের বিনিময়ে কথিত ১ ডলার দেবে তারা।(এক ডলারের মূল্যমান এদের মার্কেটে ৭৫ টাকা, ডলার কোন অ্যাকাউন্ট যোগ হবে না, আনতে হবে তাদের কাছ থেকেই!)। আর এই ক্লিকবাজি করতে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে সাত হাজার টাকা দিয়ে! কিন্তু আমরা জানি মাথায় কিছু থাকলে কাউকে কোন টাকা পয়সা না দিয়েই আউট সোর্সিং করা যায়!

সারামাস এদের ক্লিকবাজি করে পাওয়া যাবে একাউন্টপ্রতি ৩০ ডলার বা ২১০০ টাকা।  তা থেকে বাদ দিতে হবে ১৫% ভ্যাট ও একমাসের ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ বিল। আর এর পেছনে হুমড়ি খেয়ে ছুটছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা। অনেকে ২/৩টি অ্যাকাউন্ট নিয়ে দিন-রাত ক্লিক নিয়ে পড়ে থাকে। পড়াশোনা উচ্ছনে যাচ্ছে।

এতোকিছুর পরেও এদেরকে মেনে নেওয়া যেতো যদি এরা এক পয়সাও বিদেশ হতে আউট সোর্সিং করে দেশে আনতো। এরা যে ক্লিক দেওয়াচ্ছে তা মূলত এদেরই ভাড়া করা সাইট। এই ক্লিকবাজিতে কানাকড়িও বিদেশ হতে দেশে আসে না। তাহলে এদের টাকার উত্স কি?

এরা রেজিস্ট্রেশনের জন্য একাউন্টপ্রতি সাত হাজার করে টাকা নেয়। আর এদের আাসল তেলেসমাতি এখানেই!

সহজ হিসবাটা হচ্ছে এরকম: ২৫ এপ্রিল, ২০১২ তারিখ পর্যন্ত শুধু মাত্র ডোল্যন্সারেরই রেজিস্টার্ড গ্রাহকের সংখ্যা ২ লক্ষ ৭৮ হাজার ৭৫ জন।  প্রতিজনকে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য দিতে হয়েছে ১০০ ডলার (৭,৫০০ টাকা)।  তাহলে ২৭৮০৭৫×১০০= ২ কোটি ৭৮ লক্ষ ৭ হাজার ৫০০ ডলার বা ২৭৮০৭৫০০×৭৫= ২০৮ কোটি ৫৫ লক্ষ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা তারা ইতিমধ্যে হাতিয়ে নিয়েছে। এদের ওয়েব পেজে দেওয়া তথ্য মতে (আল্লাহ-ই জানে এ তথ্য কতোখানি সত্য) এ যাবৎ তারা তাদের ফ্রিল্যানসারদের আয় হিসেবে দিয়েছে ১৯ লক্ষ ৬৮ হাজার ৭৬২ ডলার বা ১৯৬৮৭৬২×৭৫= ১৪৭ কোটি ৬৫ লক্ষ ৭ হাজার ১৫০ টাকা।  এই কোম্পানির বয়স এখন এক বছর এবং এই এক বছরেই তাদের দেওয়া হিসাব মতেই তাদের হাতে এখনো পর্যন্ত নিট বাটপারি লাভ আছে ২০৮,৫৫;৬২,৫০০-১৪৭,৬৫,৭,১৫০= ১৯৩ কোটি ৭৯ লক্ষ ৫ হাজার ৩৫০ টাকা।

এভাবেই লুটপাট হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ। আগামী একবছর পরে যখন এদের গ্রাহক সংখ্যা আরো কয়েকগুন বেড়ে যাবে তখন তাদের আর ব্যবসা চালিয়ে যাওয় সম্ভব হবেনা, কারণ তখন পুরোনো গ্রাহকদের সংখ্যা বেড়ে যাবে।  ঠিক তখনই এরা গা ঢাকা দেবে।  কিন্তু লভ্যাংশ ছাড়া নয়, ‍তখনো এদের হাতে লুটে নেওয়া টাকার পরিমান কয়েকশো কোটির কম থাকবে না। ধরা খাবে অধিকাংশরা রেজিস্টার্ড ফ্রিল্যন্সাররা । বাটপার ডেসটিনির মতোই কৈ-এর তেলে কৈ ভাজে এরা।  সাথে আছে কমিশন সিস্টেম।  নতুন মেম্বার যোগ করতে পারলেই কমিশন। পুরোপুরি বাটপারি।  কোন গর্দভরা যে এদের লাইসেন্স দেয়!

আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হলো আজকাল এদের পক্ষে সাফাই গেয়ে টিভি অনুষ্ঠানও হয়!

এরা আউট সোর্সিয়ের নামে মূলত দেশের তরুনদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। তরুনদের জীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করছে, বিদ্যুতের শ্রাদ্ধ করছে, আর ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের আয়ে কিছু অবদান রাখছে!

এদের এসব কিছু দেখেও না দেখার ভান করে দেশের আইসিটি জগতের নেতৃত্বদানকারী মহীপালরা। এই মহীপালদের একজনের কাছে এই নাদান আমিএই প্রশ্নটাই তুলেছিলাম কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি।(লিংকটি ঘুরে আসুন, মজা পাবেন!)।

আসুন এদের থামাতে আমরা সচেতন হই, তরুনদের কে বোঝাই, এভাবে জীবনের মুল্যবান সময় ও কর্মক্ষমতা নষ্ট না করে, নিজেকে সৃজনশীল ও সম্মানজন কাজে যুক্ত করতে হবে। আয় করতে হবে স্বীকৃত পন্থায়, সম্মানজনক উপায়ে, বাটপারদের পাল্লায় পড়ে জীবনকে ‍উচ্ছনে দেয়ার কোন মানে নাই, নিজের সাথে সাথে অন্যের জীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করারও কোন মানে নাই।

১লা জানুয়ারি, জন্মদিন, জন্ম নিবন্ধণ এবং নামের আগে গণহারে ’মোঃ’ প্রসঙ্গ

যদিও মানুষ একবারই জন্মায়- এবং এ নিয়ে কারো কোন সন্দেহই নেই, তবুও বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন ১লা জানুয়ারি আমার দ্বিতীয়(ফেইক) জন্মদিন এবং এই জানুয়ারী মাসেই আমার আরেকটা (সত্যিকারের) জন্মদিন আছে!!! যাহোক বাংলাদেশে জন্মালে ধর্মীয় জ্ঞানে আতেল কিছু লোকের কারণে মুসলিম ছেলেদের নামের আগে বাই ডিফল্ট ’মোঃ’ যুক্ত হয়ে যায়। এদেরকে জিজ্ঞাস করলে বলে যে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা যেহেতু নামের আগে ’শ্রী’ যুক্ত করে লিখে থাকে, তাই মুসলিমদের নামের সাথে মুসলিম পরিচিতির জন্য ’মোঃ’ জুরে দেওয়া জুরুরি। অথচ আরব দেশেও আমাদের দেশের মতো নামের আগে এরকম গণহারে ‘মোহাম্মদ’ লাগানো হয় না, ’মোঃ’-এর মতো সংক্ষিপ্ত রুপেতো নয়ই। কারো নামে যদি মোহাম্মদ থাকে তাহলে তা বানান করে পুরোটাই লেখা উচিত, কোনভাবেই সংক্ষিপ্ত রুপে নয়।

আমাদের দেশের অনেকের ধারণা মুসলিম ছেলে-মেয়েদের নামের আগে অতি আবশ্যক ভাবে “মোহাম্মাদ” বা মোসাম্মৎ থাকতে হবে। এটা আবার লেখা হয় ‍‍”মোঃ” বা “মোসাঃ” দিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে যার কোন অর্থই থাকেনা। একই ভাবে আমাদের দেশের অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী কিছু স্কুল কেরানিদের কল্যাণে স্কুলের ক্রমিক সারিতে আগের দিকে থাকা ছেলে/মেয়েদের বাই ডিফল্ট জন্ম তারিখ হয়ে যায় ১ লা জানুয়ারি!!

আমার বেলায় জন্মদিনের ব্যাপারটা আরও একটু বেশীই পরিহাসের ব্যাপার। কারণ আমার সত্যিকারের জন্ম তারিখও এই জানুয়ারীতেই। স্কুল জীবনের পড়াশোনা করেছি আর দশটা ছেলের মতো গ্রামের স্কুলে। বাবা-মা ‍তার ছেলের নাম আর জন্মদিন নিয়ে চিন্তা করার মতো সচেতন ছিলেন না। স্কুলের শিক্ষরাও কখনও কোন ছাত্রের ভর্তির সময় তার নামের সঠিক বানান এবং জন্মদিন জিজ্ঞাসা করেছেন বলে দেখিনি, এমন কি গ্রামের স্কুলগুলো থেকে প্রাইমারী শেষ করা একটি ছেলে/মেয়েকে কোন প্রকার সার্টিফিকেটও দেওয়া হতো না তখন। এখনও গ্রামের স্কুল গুলোর অবস্থা এরকমই। মোদ্দাকথা নামের বানান এবং জন্ম তারিখ সঠিক ভাবে লেখার ব্যাপারে যাদের সব চেয়ে বেশি সচেতন হওয়া উচিত, তাদেরই এই ব্যাপারে কোন মাথা ব্যাথা নাই।

এসএসসি পরীক্ষার জন্য নবম শ্রেণীতে যখন আমার রেজিস্ট্রেশন করা হয় তখন আমার স্কুলের ‘কেরানি স্যার’ তার ইচ্ছামতো আমার নামের আগে “মোঃ” এবং আমাকে একটা জন্ম তারিখ দিয়ে দিয়েছেন, আর সেই দিনটা হলো ১লা জানুয়ারি!! আমি ছিলাম ক্লাশে ফার্স্ট বয়, আমার কপালে ১ লা জানুয়ারি জন্মদিনটা জুড়ে গিয়েছে। ব্যাপারটা এমন যেন আমার জন্ম হয়েছে তার ফরমায়েশ মতো দিনে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শিক্ষিত অধিকাংশ বাংলাদেশিদের জন্ম তারিখ সনদপত্রে লেখা আছে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারীর মধ্যে। এসএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধণের সময় এই জন্ম তারিখগুলো ইচ্ছামতো সাজানো হয়, এবং এতে চেষ্টা থাকে কি করে বয়স কম দেখিয়ে ছাত্রটিকে এসএসসি পাস করানো যায়। বাংলাদেশে সরকারি চাকুরির জন্য আবেদন করার বয়সসীমা ৩০ বছর। শিক্ষা-ব্যবস্থায় রাজনীতি নামক যে বিষফোড়া রয়েছে তার কল্যাণে যে সেশন-জট বাই ডিফল্ট পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীদের কপালে অবধারিতভাবে জুড়ে যায়, তার কারণে শিক্ষকরা চান তাদের ছাত্ররা কাগজে-কলমে তাদের ছাত্ররা কম বয়স নিয়ে পাশ করুক। তাই রেজিস্ট্রেশনের সময় ছাত্রদের বয়স ইচ্ছামতো কমিয়ে দেয়া হয়। এতে ভবিষ্যতে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকুরীতে চেষ্টা করতে সুবিধা হয়। আর এই সুবিধাটি ছাত্রকে পাইয়ে দিতে গিয়ে গ্রামের স্কুলের শিক্ষরা তাদের অজান্তেই অধিকাংশ ছাত্রের বেলায়ই ভবিষ্যতের একজন সম্ভাবনাময় ব্যক্তি তথা ছাত্রটির জন্মদিন এমনভাবে লিখে দেন যে সেই ছাত্রটি বাস্তব জীবনে কর্ম ক্ষেত্রে গিয়ে এই সুবিধার অসুবিধাটা টের পান।

কেউ হয়তো আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি আমার প্রকৃত জন্ম তারিখটাই বলবো। কিন্তু সারা জীবনের জন্য আমার জাতীয় পরিচয় পত্র, একাডেমিক পরিচয় পত্র, সকল সনদপত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স সহ সকল আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে আমার এই মিথ্যে জন্ম তারিখ লেখা হবে, এবং প্রদর্শিত হবে। ব্যাপারটা যে কতোটা মান-হানিকর কেবল মাত্র এর ভুক্তভোগীরাই জানেন। বছরের প্রথম দিনে যে কেউ জন্মাবে না তা নয়। কিন্তু যখন গণহারে সবার জন্মদিন একই তারিখ হয়ে যায় তখন কি এই মিথ্যার বেসাতি খুব নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে না?

শোনা যায় ভিনদেশিরা আমাদের বাংলাদেশিদের জন্মতারিখ এবং নাম নিয়ে রীতিমত ব্যঙ্গ করে থাকে। কারণ তাদের কাছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কিংবা চাকুরীর প্রয়োজনে যখনই বাংলাদেশিদের কাগজপত্র দেয়া হয় তারা দেখে বাংলাদেশিদের অধিকাংশেরই নামের সাথে বাই ডিফল্ট ’MD.’ দুটো অক্ষর আছে যার অর্থ তাদের কাছে Master of Medicine! আর সবারই জন্ম তারিখ মোটামুটি জানুয়ারি এবং তা আবার অনেকেরই বছরের প্রথম দিন!!!

মঈন উদ্দিন আমল থেকে জন্ম নিবন্ধনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বাস্তবে জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোন সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। যে কেউ আরো আছে স্কুল গুলোতে ভর্তির সময় বা রেজিস্ট্রেশন করার সময় নামের সাথে গণহারে ’মোঃ’, ’মোসাঃ’ জুড়ে দেওয়ার ব্যাপার। আসল সমস্যা টের পাওয়া যায় বাস্তব জীবনে যখন এইসব নাম নিয়ে কোন কাজ করতে গিয়ে।

একটি বাঁধের ছবি এবং আরো কিছু কথা

Farakka Barrage, West Bengal, India

Farakka Barrage, West Bengal, India

ব্লগে একটা ছবি শেয়ার করি। একটু আগে গুগল ম্যাপস আর্থ ভিউ হতে এই ছবিটা স্ক্রিণশট হিসেবে নিয়েছি। এটি একটি বাঁধের স্যাটেলাইট ভিউ। আপনাদের কাছে জানতে চাইবো বলুনতো জায়গা কোথায় অবস্থিত? ধরতে পারছেন না?

আমি ক্লু দিচ্ছি, এটি এশিয়ার একটি দাদা দেশ, নব জাতক একটি ছোট দেশকে পানি থেকে শুকিয়ে মারার জন্য আন্তর্জাতিক সব নিয়ম কানুন উপেক্ষা করে এটি প্রায় ৩৬ বছর আগে নবজাতক দেশটির উজানে চালু করেছিল।

চালু করার আগে অবশ্য নবজাতক ছোট দেশটির প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দাদা দেশটি অনুষ্ঠানিক ‍অনাপত্তি অনুমতি নিয়ে ছিলো। বলা বাহুল্য নব জাতক দেশটির প্রেসিডেন্ট দাদা দেশটিকে পরম বন্ধু ভেবে ৯০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বাধটির কার্যক্রম চালু করার এক আত্মঘাতী এবং হাস্যকর অন‍াপত্তি সম্মতি প্রদান করেছিলেন।

৩৬ বছর আগে চালু হবার পর বাঁধটি আর কোন দিনই বন্ধ হয়নি। অর্থাৎ দাদা দেশটি তার ভৌগলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে উজানের পানি ‍আটকে তা নিজেদের মরু অঞ্চলে ডাইভার্ট করে নিয়েছে, নিজেদের কৃষি কাজে ব্যবহার করেছে।

একই সাথে অন্তর্জাতিক নদী আইনের সব নিয়ম কানুনকে বুড়ো ‍আঙ্গুল দেখিয়ে মাত্র ৩৬ বছরে নবজাতক দেশটির জলবায়ু, নদীর স্রোতধারা, মৎস সম্পদ, প্রকৃতি, কৃষিজ উৎপাদন, তথা প্রাকৃতির জীব বৈচিত্র’র বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।

অনুজ দেশটিতে ৪০ বছর আগে ছোটবড় প্রায় চার হাজার নদী ছিলো। আজ ৪০ বছর পর সেই সংখ্যাটা এখন ২০০ এর কিছু কমবেশী! 



অবশ্য এ নিয়ে নব জাতক দেশটির মাথাওয়ালা লোকগুলোর তেমন কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। নবজাতক দেশটি এখন যৌবনে পৌছেছে, অনেক অনেক মাথাওয়ালা ব্যক্তিবর্গ এই দেশটির সরকার প্রধান হয়েছেন, দেশ ও জাতি উদ্ধার করেছেন। কিন্তু নদী না থাকলে দেশটির অস্তিত্ব থাকবেনা, ধুধু সাহারা মরুভূমির মতোই হয়ে যাবে দেশের বুক, এতো ক্ষুদ্র বিষয় তাদের বড় মাথায় আসেনা।

তারপরও দেশটিতে কিছু কিছু ছোট খাটো মাথার লোক আছেন যারা এই ক্ষুদ্র বিষয়টা বুঝেন এবং প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেন। আনু মোহাম্মদ নামক একব্যক্তি তাদের একজন। তার আবার অনেক তরুন ভক্ত আছে, তারা আবার ব্লগে লিখে থাকে। সমস্যা হলো দেশটিতে আবার আরেক শ্রেণীর তরুণ আছে যাদের দেশ প্রেম অসম্ভব গভীর। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর তরুণরা দেশটির দাদা দেশ তথা পরম বন্ধু দেশ সম্পর্কে কোন কটু কথাই সহ্য করতে পারেন না। অবধারিত ভাবেই দাদা দেশের অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বল্লেই তার জন্ম পরিচয় নিয়ে এই দ্বিতীয় শ্রেণীর তরুণরা চরম সন্দিহান হয়ে যান। যারা প্রতিবাদ করেন, দাদা দেশের এমন দাদাগিরির সমালোচনা করেন অনেক সুশীলের কাছে তারা হয়ে যান দেশদ্রোহী। হয়তো এই পোস্টদাতাও পেয়ে যাবে রাজাকার খেতাব। 

আফসোস হয় অনুজ দেশটি একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যেদিয়ে এক রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে ও নব্য রাহুর গ্রাসে পরিনত হলো। দেশটির জন্মের ৩৯ বছর ধরে বিভিন্নভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় করা দাদা দেশটির সাহায্যের ঋণই পরিশোধ করে যাচ্ছে। ঋন পরিশোধ করছে আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গা-পদ্মার পানি দাদা দেশকে একচ্ছত্র ব্যবহার করার অধিকার দেওয়ার মাধ্যমে, ঋণ পরিশোধ করছে প্রতিনিয়ত সীমান্তে বিএসএফসের গুলিতে অনুজ দেশটির নিরহ মানুষ হত্যার লাইসেন্স দিয়ে, ঋণ পরিশোধ করছে দেশটি দাদা দেশটির একচ্ছত্র এবং বাণিজ্য ভারসাম্যাবিহীন অবাধ বাণিজ্য করার সুযোগ দিয়ে। এখন আরো দেবে টিপাইমুখে বাঁধ দেওয়ার মাধ্যমে, উচ্চহারে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে এবং পন্য-ট্রানজিট দেওয়ার মাধ্যমে। ভবিষ্যতে দিয়েই যাবে। এজন্যই কি দেশটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছিলো? একদেশের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে অন্যদেশের রাহুর কবলে পড়ার জন্য?

দাদা দেশটি অবশ্য তার প্রতিবেশী এই দেশটিকে অতো খাটো করে দেখেনা। পানি ডাইভার্ট করে নেওয়ার পর দাদা দেশটির পর কৃষির অসম্ভব উন্নতি সাধিত হয়েছে। তাই দয়া পরবশ হয়ে প্রতিবেশী অনুজ দেশের কাছে আলূ, পেয়াজ, আদা, রসুন, ডাল প্রভৃতি রপ্তানি করে থাকে। অন্যদিকে অনুজ দেশটি তুলনায় সরিষাটাও দাদার কাছে বিক্রি করতে পারেনা, বানিজ্য ঘাটতি লেগে থাকে হাজার হাজার কোটি টাকার।

দাদা দেশটি এবার মনযোগ দিয়েছে টিপাইমুখ নামক একটা স্থানে উজানে নদীর ওপর বাধ দেওয়ার ওপর। এতেও অনুজ দেশটির বড় বড় মাথাওয়ালা পলিটিশিয়ানদের ঘুম ভাঙ্গেনি। বরং অনুজ এই দেশটি যখন একদমই নবজাতক সেই সময়কার প্রেসিডেন্টের মতোই দেশটির বর্তমান সরকার প্রধান এই বাধ স্থাপনে অনাপত্তি চুক্তি সই করে এসেছেন। বিনিময়ে দাদা দেশটি হয়তো কিছু দেবে এই যা আশা অনুজ দেশটির সরকারের।

তবুও তো দাদা, দাদাই। যাই হোক, দাদা দেশটি কিন্তু বিপদের সময় সাহায্য ঠিকই করে। পচা চাল দিয়ে হলেও অসময়ে খাদ্য যোগান দেয়, নাহয় দামটা একটু বেশীই রাখে। দাদার দেশ যখন বন্যায় ভেসে যায়, তখন এই স্লুইস গেটগুলো ঠিকই খুলে যায়, দাদা দেশটির করুনায় অনুজ দেশটির তৃষ্ণার্ত বুক ঠান্ডা হয়, সারা বছর যেটুকু পাওনা ছিলো অনুজ দেশটির তা একবারেই পুষিয়ে দেয় দাদা দেশ।

অভ্র-বিজয় বিতর্ক: কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে বাংলা লেখার কমন প্লাটফর্ম কবে হবে?

ব্লগে ব্লগে এখন তুমুল বিতর্ক চলছে অভ্র আর বিজয় নিয়ে। জাতি হিসেবে যে আমরা সব দিক দিয়েই বিভক্ত তার নজির বহু আগে থেকেই আমাদের কম্পিউটারের বর্ণমালায়ও যুক্ত হয়েছে। কম্পিউটারের কীবোর্ডের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে বিজয়ের প্রথম প্রকাশেরও অন্ততঃ এক দশক পরে। তখন কম্পিউটারে বাংলা লেখার মাধ্যম বলতে আমার মতো নবীন ব্যবহারকারীরা বিজয়কেই জানতো। শুরুতে কম্পিউটারে বাংলা লেখা আর ওয়েব পেজে বাংলা দেখার ইতিহাসটা খুব মসৃণ ছিলোনা। আমরা যে আজ সমৃদ্ধ সামহোয়ারইন ব্লগ বা উইকিপিডিয়া বাংলা সাইট, প্রায় সকল বাংলা পত্রিকার অতি চমৎকার অনলাইন সংস্করণ দেখতে পাই, এক দশক আগেও এসবের এমন সরব উপস্থিতি ছিলো না। তাই তখনো বাংলায় ওয়েব পেজ ডিজাইন খুব প্রচলিত ছিলো না। আসকি-আনসি, ইসকি-ডিওই আর সুমিত প্রভৃতি কোডের প্যাঁচগোছের কারণে তখন বাংলায় ওয়েব পেজ ডিজাইন যেমন খুব সহজ ছিলোনা, তেমনি এসব কোডিং-এর ফন্ট দিয়ে ডিজাইন করা ওয়েব পেজ সকল পিসিতে সঠিকভাবে দেখাও যেতো না।

বাংলায় মেইল করতে হলে ফাইলকে এটাচমেন্ট হিসেবে পাঠিয়ে যে ফন্টে লেখা হয়েছে তার একটা কপিও যুক্ত করা লাগতো সেই মেইলের সাথে! সারা দুনিয়ার ভাষার বর্ণমালার জন্য একটা স্টান্ডার্ড কোডিং মান ইউনিকোড-এ বাংলা ফন্ট যুক্ত হবার পর ধীরে ধীরে সেই ঝামেলা পেরিয়ে আজ অনেক চমৎকার বাংলা ওয়েব পেজ তৈরি হচ্ছে, আমরা পেয়েছি আন্তর্জাতিক মানের অতি চমৎকার অনেক বাংলা ওয়েব পেজ। এখনো উন্নতি হচ্ছে ইউনিকোড এনকোডিং মানের। সেই সাথে উন্নতি হচ্ছে অপারেটিং সিস্টেমের। মাইক্রোসফটের উইনডোজ এক্সপি অপারেটিং সিস্টেমে ডিফল্ট উইনডোজ সেটিংসে বাংলা ওয়েব পেজ দেখার ব্যবস্থা ছিলোনা। এজন্য আলাদা কমপ্লেক্স স্ক্রিপ্ট ইনস্টল করতে হতো। কিন্তু মাইক্রোসফট তার সর্বশেষ অপারেটিং সিস্টেম উইনডোজ সেভেন-এ বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। কোনপ্রকার কনফিগারেশনের পরিবর্তন না করেও ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ৮ ব্যবহার করে ওয়েব পেজে অনেক চমৎকার বাংলা দেখা যায় উইনডোজ সেভেন অপারেটিং সিস্টেমে। প্রযুক্তির এই যে উৎকর্ষতা তা অনেক বন্ধুর পথ পেরিয়ে আজ এ পর্যন্ত এসেছে।

কম্পউটারে বাংলা লেখার ইতিহাস খুব বেশী দিনের না হলেও খুব কম সময়ের না। অবশ্য কম্পউটারে বাংলা লেখার সফটওয়্যার তৈরি হওয়ার বহু আগে ১৯৬৯ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী ‘মুনীর কীবোর্ড’ নামক একটি বাংলা টাইপ রাইটার কীবোর্ড উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে এই কীবোর্ডের লে-আউট ব্যবহার করে কম্পিউটারে বাংলা লেখার সফটয়্যারও তৈরি হয়েছে। দুই দশক পেরিয়ে গেছে কম্পিউটারে বাংলা যুক্ত হয়েছে। তবুও কম্পিউটারে বাংলা লেখার ইতিহাসটা কখনোই কিন্তু মসৃণ হয়নি। দুই দশক পেরিয়ে এসেও বাংলা লেখার কীবোর্ড ইস্যুতে জাতীয় অন্যান্য ইস্যুর মতো এখানেও আমরা বহু ধারায় বিভক্ত। কম্পিউটারে যখন বাংলা লেখার শুরু হয় তখন এর জন্য একটা কমন প্লাটফর্ম তৈরি না করে যে যেভাবে পেরেছেন কীবোর্ড লে-আউট ডিজাইন করেছেন। যে যার সুবিধামতো এনকোডিং ব্যবহার করে কীবোর্ড আর ফন্টের প্রোগ্রামিং করেছেন। ফলে যা হবার তা-ই হয়েছে। মুনীর কীবোর্ড, সত্যজিৎ কীবোর্ড, গীতাঞ্জলী কীবোর্ড, শহীদ কীবোর্ড, বসুন্ধরা কীবোর্ড, লেখনী কীবোর্ড, বিজয় কীবোর্ড, ন্যাশনাল কীবোর্ড, অভ্র কীবোর্ড এবং অধুনা রোকেয়া কীবোর্ড- প্রভৃতি কীবোর্ড লে- আউট পেয়েছি অনেক, সেই সাথে ঝামেলাও পেয়েছি অনেক।

আজ অবধি বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা লেখার কোন কমন বা সাধারণ প্লাটফর্ম তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের ব্যবহারকারীরা এক কীবোর্ড ব্যবহার করেন তো, ভারতের বাংলাভাষী ব্যবহার কারীরা অন্যটি। ওপেন সোর্স অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স ছাড়া মাইক্রোসফটের উইনডোজ সেভেনের আগ পর্যন্ত কোন অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা লেখার ডিফল্ট কোন কীবোর্ড যুক্ত হয়নি। উইনডোজ সেভেনে বাংলা লেখার দুইটি কীবোর্ড যুক্ত হয়েছে, একটি আমাদের ন্যাশনাল কীবোর্ড অন্যটি ভারতীয় বাংলা কীবোর্ড।

জব্বার সাহেবের কৌশলী কার্যক্রমের কারণেই হোক আর ব্যবহারে সুবিধার কারণেই হোক বাংলাদেশে কীবোর্ড ব্যবহারের দিক দিয়ে বিজয় সবচেয়ে এগিয়ে। কয়েকদিন আগে একজন ব্লগার জানলেন ১৯৯৮ সালে মাইক্রোসফট কর্মকর্তারা বাংলাদেশে এসেছিলেন তাদের অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা কীবোর্ড যুক্ত কারার জন্য। কিন্তু জব্বার সাহেব তার প্রভাব ও কানেকশনকে কাজে লাগিয়ে মাইক্রোসফটের সেই প্রচেষ্টাকে আটকে দেন (তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলো তারপ্রতি সহানুভূতিশীল এখনকার সরকার দল)। কারণ তখন সরকারি অফিসে লেখনী আর মুনীর ব্যবহার হতো যা ছিলো কারো ব্যক্তিগত স্বত্ব বিহীন। যদি সে সময়ে মুনীর বা লেখনীর কোন একটি কীবোর্ড উইনডোজ অপারেটিং সিস্টেমে যুক্ত হতো তাহলে আমরা আজেকে যে বিজয়ে একচেটিয়া ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি, সেই জায়গাটি হয়তো দখল করতো সেই কীবোর্ড। মোস্তফা জব্বার সাহেব তখন সেটি হতে দেননি কারণ তাতে তার বিজয় লে-আউটের কীবোর্ড সফটয়্যার ব্যবসায় মার খাবার সম্ভাবনা ছিলো। শেষে মাইক্রোসফট বাংলাদেশ ছাড়ে এই বলে যে তোমরা আগে সিদ্ধান্ত নাও কোনটি ব্যবহার করবে, তারপর আমরা তোমাদের কীবোর্ড উইনডোজে যোগ করবো ।

আজও আমাদেরকে কম্পিউটারে বাংলা লিখতে হয় অভ্র বা বিজয় জাতীয় কোন থার্ড পার্টি কোন সফটয়্যার ব্যবহার করে । যদিও বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বুয়েট কর্তৃক উদ্ভাবিত ন্যাশনাল কীবোর্ডের (যা শুরু থেকে ইউনিকোড সমর্থন করে, উল্লেখ্য বিজয় ইউনিকোড সমর্থন করে মাত্র ২০০৫ সাল হতে) দুইটি সংস্করণ এ যাবৎ প্রমিত করেছে এবং মাইক্রোসফটের অপারেটিং সিস্টেম উইনডোজ সেভেন-এ এই ন্যাশনাল কীবোর্ড ডিফল্ট বাংলা কীবোর্ড হিসেবে যুক্ত হয়েছে, তবুও এর ব্যবহার হয়না বল্লেই চলে। ন্যাশনাল কীবোর্ড সম্পর্কে কতোজন মানুষ জানেন তাও সন্দেহের বিষয়। এর কারণ কীবোর্ড ব্যবহার একটি অভ্যাসের বিষয়। মানুষ যেটিতে একবার অভ্যস্ত হয়ে যায় তা থেকে বের হয়ে কেউ নিশ্চয়ই আবার আরেকটা কীবোর্ড লে-আউট মুখাস্ত করবেন না ।

এ প্রসঙ্গে বোরাক (DVORAK) কীবোর্ডের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ইংরেজি QWERTY কীবোর্ড বাজারে আসার অনেক পরে ১৯৩২ সালে বাজারে আসে বোরাক কীবোর্ড। বলা হয়ে থাকে বোরাক কীবোর্ড, কোয়ার্টি কীবোর্ড অপেক্ষা অনেক বেশী দক্ষতা সম্পন্ন, কিন্তু বোরাক তখন আর জনপ্রিয়তা পায়নি। কারণ ততোদিনে কোয়ার্টিতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো (তথ্য সুত্র: টাইপিং টিউটর সফটয়্যার: Ten Thumbs Typing tutor)। আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো অন্য কোন কীবোর্ড তৈরি ও তার নিয়মিত আপডেট হয়নি বা অন্যান্য কীবোর্ড পৃষ্ঠপোষকতাও পায়নি। এজন্যই বিজয় জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা এতোদিনে বিজয়ের সাথে অভ্যস্থ হয়ে গেছে। কম্পিউটারের খুটিনাটি বিষয়ে ব্যাপক ধারণা রাখেন- এমন কম্পিউটার ব্যবহারকারী ছাড়া খুব কম ইউজারই বাংলা লেখার জন্য বিজয় ব্যতীত অভ্র বা অন্যান্য সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। তাই এর ব্যবহার আসলেই একচেটিয়া। আর মানুষের এই অভ্যস্ততাকে পুঁজি করে ব্যবসা করে যাচ্ছেন মোস্তফা জব্বার। উইনডোজ সেভেন ৬৪ বিট অপারেটিং সিস্টেমে লেখার জন্য বিজয় একুশে ছাড়া প্রাথমিকভাবে অন্য কোন সফটওয়্যার কাজ করতো না। তিনি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিজয় একুশে সফটওয়্যার-এর দাম নির্ধারণ করেছেন পাঁচ হাজার টাকা! জব্বার সাহেব সত্যিই একজন প্রকৃত বর্ণমালা ব্যবসায়ী! পৃথিবীর আর কোন ভাষা কম্পিউটারে লেখার জন্য এমন থার্ড পার্টি সফটয়্যার ব্যবহার করতে হয় কি-না আমার জানা নেই। তবে না থাকার সম্ভাবনাই বেশী। তবে সেক্ষেত্রে নিজেদের ভাষা কম্পিউটারে লেখার জন্য থার্ড পার্টি সফটয়্যার ব্যবহারের একমাত্র কৃতিত্ব আমাদের ই আছে!

মোস্তফা জব্বার সাহেব দাবী করেছেন তার ডিজাইনকৃত বিজয় কীবোর্ডের নকশা বা লে-আউট নাকি হুবহু অনুকরণ করা হয়েছে অভ্রর ইউনিজয় অংশে। তার দাবী কতোখানি যেীক্তিক বা অযেীক্তিক সেই প্রসঙ্গে আমি যাবো না। আমি মনেকরি ইউনিজয় আর বিজয় নিয়ে এখন ঝগড়া না করে সময় এসেছে কম্পিউটারে বাংলা লেখার একটা কমন এবং ওপেন সোর্স প্লাটফর্ম তৈরি করার এবং এটা আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই করতে হবে। অভ্র একটা ওপেন সোর্স প্লাটফর্ম বটে; কিন্তু ইংরেজি বর্ণের অনুকরণে ফোনেটিকের সাহায্যে বাংলা লেখা মূলত একটা অস্থায়ী সমাধান। নিজস্ব বর্ণমালা থাকতে অন্যভাষার বর্ণের অনুকরণে ফোনেটিকে লেখাটা লজ্জারও বটে। তবুও অভ্রকে ছোট করে দেখবার সুযোগ নেই। কারণ অভ্র একজন বর্ণমালা ব্যবসায়ীর হাত থেকে রেহাই দিয়েছে অনেক কম্পিউটার ব্যবহারকারীকে। সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা যেহেতু বিজয় লে- আউটে টাইপ করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাই মোস্তফা জব্বার সাহেব চাইবেন তার বিজয়ে স্বত্ব ধরে রেখে একচেটিয়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে। আর আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে বাংলা কীবোর্ডকে একটি সম্মিলিত সাধারণ প্লাটফর্ম দেওয়ার জন্য যাতে আগামী প্রজন্ম এই বহুবিধ কীবোর্ডের ঝামেলা হতে মু্ক্তি পেতে পারে। একটি সভ্য জাতির ভাষা লেখার জন্য একাধিক কীবোর্ড লে আউট কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আজ যদি শহীদ মুনীর চৌধুরি বেঁচে থাকতেন তাহলে কম্পিউটারে বাংলা লেখার ইতিহাসটা অন্যরকমও হতে পারতো। কিন্তু সেটা হয়নি। মহীরুহ ব্যক্তিত্ব অকালে পৃথিবীত থেকে হারিয়ে যান। আর সাধারণের মধ্যে থেকে ওঠে আসা দু’ একজন যদিও মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার জন্য কোন একটি অসাধারণ কাজ করেও ফেলে- শুধু ব্যবসায়িক বা ব্যাক্তিস্বার্থের কারণে সে-ই জায়গাটায় পৌছাতে পারেন না। জব্বার সাহেব বোধহয় তাদের মধ্যে একজন। আজ যে বিজয় নিয়ে তার এত গর্ব, এতো অহংকার সেই বিজয়ের লে-আউটের ডিজাইনের পেছনে রয়েছে পূর্ববর্তী মুনীর কীবোর্ডের অবদান, রয়েছে বিজয় প্রকল্পে কাজ করা অনেক ব্যাক্তির অবদান। বিজয়ের প্রথম সংস্করণের প্রোগ্রমিং করে দিয়েছিলেন দেবেন্দ্র জোশী নামক একজন ভারতীয়, পরবর্তীতে বিজয় প্রোগ্রামিং করেন গোলাম ফারুক আহমেদ, নিয়াজ আহমেদ, মনিরুল আবেদিন পাপ্পন্, কামরুজ্জামান, হোসনে আরা চৌধুরি, মহফুজুর রহমান মাসুম সহ আরো অনেকে। এছাড়াও ফন্ট ডিজাইন ও ডিজিটাইজিং সহ অন্যান্য অনেক কাজে একটি বিশাল কর্মী বাহিনী কাজ করেছেন (মোস্তফা জব্বারের বিজয় গাইড দ্রষ্টব্য)। জব্বার সাহেব যেটি করেছেন তা হলো কোয়ার্টি কীবোর্ডের অনুকরণে বাংলা কীবোর্ডের একটা লে-আউট সাজিয়েছেন এবং এই কীবোর্ডের সফটয়্যার তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একটি কীবোর্ডের নকশা করা আর সেই কীবোর্ডের প্রোগ্রামিং কোনভাবেই এক বিষয় নয়। 

বস্তুতঃ বিজয় উদ্ভাবনে আমি তার অবদানকে কোনভাবেই ছোট করে দেখছিনা, একই সাথে বলতে চাই বিজয় কোনভাবেই তার একক সৃস্টি নয়। এটি একটি সম্মিলিত প্রয়াসের ফসল যার পুরোটা কৃতিত্ব তিনি একাই দাবি করছেন, নিজের নামে পেটেন্ট নিয়েছেন, দুই দশক ধরে ব্যবসাও করেছেন, বিজয় তার নেতৃত্বে উদ্ভাবিত হয়েছে, তাই ব্যবসা করার অধিকারও তার আছে— তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। শুধু একটা লে-আউট ডিজাইন করে জব্বার সাহেব একাই কীবোর্ডের পেটেন্টের মালিক, সমস্ত স্তত্ব তার একার, আর যিনি বা যারা প্রোগ্রামিং করলেন তাদের নামগন্ধও নেই কোথাও। আমি মনেকরি মোস্তফা জব্বারের আরো অনেক আগেই বানিজিৎক মনোভাব বাদ দিয়ে সাধারণের জন্য বিজয়কে উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত ছিলো। সেক্ষেত্রে বিজয় জাতীয় কীবোর্ডের মর্যাদা পেতেও পারতো। এখনো যে সে সুযোগ নেই তা-ও কিন্তু নয়। কিন্তু তার বিজয়ের লে-আউটের একটা অংশ ব্যবহার করে অভ্র-এর ইউনিজয় সফটয়্যার লেখা হয়েছে বলে তিনি যেভাবে হুংকার দিয়ে যাচ্ছেন, তাতে কি তিনি আদৌ বিজয়কে উন্মুক্ত করে দেবেন বলে মনে হয়?

আমি আগেই বলেছি কীবোর্ড একটা অভ্যাসের বিষয়। মানুষ যাতে একবার অভ্যস্ত হয়ে যায়, সেটা থেকে বের হয়ে অন্য একটা কীবোর্ড কেউ ই মুখাস্ত করতে চাইবে না। বিজয় কীবোর্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি চন্দ্রবিন্দু, বিসর্গ, এবং খন্ড ত- এই তিনটি বর্ণ ছাড়া অন্যসব বর্ণই ইংরেজি কোয়ার্টি কীবোর্ডের ইংরেজি বর্ণমালার বোতাম ব্যবহার করে লেখা যায় তথা টাচ টাইপিংয়ের জন্য আদর্শ কীবোর্ড। ন্যাশনাল কীবোর্ডে বাংলা লেখার সময় ইংরেজি বর্ণমালার বিরাম চিহ্ন ব্যবহার করা যায় না। বিজয়ে সে অসুবিধা নেই। সেদিক থেকে বিজয় সবচেয়ে বিজ্ঞান সম্মত কীবোর্ডও বলা যায়। ইউনিজয় বা বিজয় যা- ই বলি না কেন আমরা অনেকেই কিন্তু এই লে- আউটে টাইপ করে অভ্যস্ত। তাই যদি বিজয় বা ইউনিজয় জাতীয় কীবোর্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তাহলে তা ডিফল্ট বাংলা কীবোর্ড হিসেবে যুক্ত হতে পারে মাইক্রোসফটের পরবর্তী অপারেটিং সিস্টেম উইনডোজ এইট-এ। আমরা মুক্ত হবো বাংলা লেখার জন্য থার্ড পার্টি সফটয়্যার ব্যবহারের ঝামেলা থেকে। পরবর্তী জেনারেশন মু্ক্ত হবে একটি অভিশাপ থেকে। মোস্তফা জব্বার কি পারবেন তার ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হতে? তিনি কি চাইবেন না তার নাম ইতিহাসে একজন বর্ণমালা বনিক হিসেবে নয়, বরং বাংলা লেখার জন্য উন্মুক্ত কীবোর্ডের উদ্ভাবক হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাক? 

আরো কিছু কথা:

যদিও ন্যাশনাল কীবোর্ড নামে বাংলা লেখার কীবোর্ড সরকার কর্তৃক প্রমিত করা হয়েছে, তথাপি এর ব্যবহার খুবই সীমিত, অথবা নেই বল্লেই চলে। আপনারা কেউ কি লক্ষ্য করেছেন ঈদানিং নকিয়াসহ বিভিন্ন ব্রান্ডের স্মার্টফোন তৈরি হচ্ছে ইংরেজি কোয়ার্টি কীবোর্ড ব্যবহার করে? যেমন নকিায় ই সিরিজের ই৭১, ই৭২, এন সিরিজের এন ৯০০, এন ৯৭ প্রভৃতি। নকিয়া সহ অন্যান্য ব্রান্ডের আরো স্মার্টফোন ভবিষ্যতে বাজারে আসছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কি জানেন, স্মার্টফোনে বাংলা লেখাতো দূরের কথা বাংলা দেখার ব্যবস্থাও নেই। নকিয়ার স্মার্টফোন তৈরি হয় সিমবিয়ান অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে। এই অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা লেখা ও দেখার জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। তবে নকিয়া ৯ কী সম্বলিত জাভা সমর্থিত ফোনে ইতোমধ্যে বাংলা ভাষার প্রবেশ ঘটিয়েছে। টি৯ ব্যবহার করেও লেখার ব্যবস্থার করা হয়েছে। তাই স্মার্টফোনে বাংলা প্রবেশ করানোও তাদের জন্য খুব কঠিন হবে বলে মনে হয় না। শুনেছি আইফোনে বাংলা লেখা যায় না, কিন্তু ইউনিকোড কোডিং লেখা বাংলা দেখা যায় তবে সঠিকভাবে দেখায় না।

জাতি হিসেবে আমরা সব দিকে দিয়েই পিছিয়ে, এখানেও তাই। অনেক আগেই যেমন কম্পিউটারে বাংলা কীবোর্ডের ইস্যুটি মীমাংসা করে ফেলা উচিত ছিলো, সেই সাথে ঐ কীবোর্ড কে ভিত্তি করে স্মার্টফোনেও বাংলা দেখা ও লেখার ভিত্তি কি হবে তা নির্ধারণ করা উচিত ছিলো। তাই আজকের বিজয় বা ইউনিজয় যাই বলি না কেন, এটিকে উন্মুক্ত করে দেয়া হলে এটিই হতে পারে কম্পিউটার সহ স্মার্টফোনে বাংলা লেখার কমন প্লাটফর্ম। আমরা কি পারবো না এমন একটি কমন প্লাটফর্ম তৈরি করতে, সারা দুনিয়ার বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য না হোক অন্ততঃ বাংলাদেশীদের জন্য?