আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারণার ফাঁদে তরুণরা

আউটসোর্সিংয়ের নামে  প্রতারণা চলছে দেশে। ডিজিটাল প্রতারণা।  ডোল্যান্সার, স্কাইল্যান্সার, বিডিএস ক্লিক সেন্টার- আরো হরেক নাম। কাজ একটাই- তরুণদেরকে কথিত আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা তুলে নেওয়া।

আউট সোর্সিং-এর নামে এই যে হরেকনামের কতগুলো ভূঁইফুর কম্পানি দেশে তরুণদের তথাকথিত আয় করার সুযোগ করে দিচ্ছে তা মূলতঃ আরেকধরনের এমএলএম জাতীয় পিটিসি উৎপাত। পালের গোদা ডোল্যান্সার। গত বছর এদের আবির্ভাব ঘটে। এদের দেখাদেখি স্কাইলান্সার, বিডিএস ক্লিক সেন্টার আরো অনেক নামে এদের বাটপারি শুরু হয়েছে। এদের তথাকথিত আউট সোর্সিং বলতে বুঝায় একাউন্টপ্রতি দিনের মূল্যবান সময়ের ২/৩ ঘন্টা বসে বসে ক্লিক বাজি করা।  ১০০ ক্লিকের বিনিময়ে কথিত ১ ডলার দেবে তারা।(এক ডলারের মূল্যমান এদের মার্কেটে ৭৫ টাকা, ডলার কোন অ্যাকাউন্ট যোগ হবে না, আনতে হবে তাদের কাছ থেকেই!)। আর এই ক্লিকবাজি করতে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে সাত হাজার টাকা দিয়ে! কিন্তু আমরা জানি মাথায় কিছু থাকলে কাউকে কোন টাকা পয়সা না দিয়েই আউট সোর্সিং করা যায়!

সারামাস এদের ক্লিকবাজি করে পাওয়া যাবে একাউন্টপ্রতি ৩০ ডলার বা ২১০০ টাকা।  তা থেকে বাদ দিতে হবে ১৫% ভ্যাট ও একমাসের ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ বিল। আর এর পেছনে হুমড়ি খেয়ে ছুটছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা। অনেকে ২/৩টি অ্যাকাউন্ট নিয়ে দিন-রাত ক্লিক নিয়ে পড়ে থাকে। পড়াশোনা উচ্ছনে যাচ্ছে।

এতোকিছুর পরেও এদেরকে মেনে নেওয়া যেতো যদি এরা এক পয়সাও বিদেশ হতে আউট সোর্সিং করে দেশে আনতো। এরা যে ক্লিক দেওয়াচ্ছে তা মূলত এদেরই ভাড়া করা সাইট। এই ক্লিকবাজিতে কানাকড়িও বিদেশ হতে দেশে আসে না। তাহলে এদের টাকার উত্স কি?

এরা রেজিস্ট্রেশনের জন্য একাউন্টপ্রতি সাত হাজার করে টাকা নেয়। আর এদের আাসল তেলেসমাতি এখানেই!

সহজ হিসবাটা হচ্ছে এরকম: ২৫ এপ্রিল, ২০১২ তারিখ পর্যন্ত শুধু মাত্র ডোল্যন্সারেরই রেজিস্টার্ড গ্রাহকের সংখ্যা ২ লক্ষ ৭৮ হাজার ৭৫ জন।  প্রতিজনকে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য দিতে হয়েছে ১০০ ডলার (৭,৫০০ টাকা)।  তাহলে ২৭৮০৭৫×১০০= ২ কোটি ৭৮ লক্ষ ৭ হাজার ৫০০ ডলার বা ২৭৮০৭৫০০×৭৫= ২০৮ কোটি ৫৫ লক্ষ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা তারা ইতিমধ্যে হাতিয়ে নিয়েছে। এদের ওয়েব পেজে দেওয়া তথ্য মতে (আল্লাহ-ই জানে এ তথ্য কতোখানি সত্য) এ যাবৎ তারা তাদের ফ্রিল্যানসারদের আয় হিসেবে দিয়েছে ১৯ লক্ষ ৬৮ হাজার ৭৬২ ডলার বা ১৯৬৮৭৬২×৭৫= ১৪৭ কোটি ৬৫ লক্ষ ৭ হাজার ১৫০ টাকা।  এই কোম্পানির বয়স এখন এক বছর এবং এই এক বছরেই তাদের দেওয়া হিসাব মতেই তাদের হাতে এখনো পর্যন্ত নিট বাটপারি লাভ আছে ২০৮,৫৫;৬২,৫০০-১৪৭,৬৫,৭,১৫০= ১৯৩ কোটি ৭৯ লক্ষ ৫ হাজার ৩৫০ টাকা।

এভাবেই লুটপাট হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ। আগামী একবছর পরে যখন এদের গ্রাহক সংখ্যা আরো কয়েকগুন বেড়ে যাবে তখন তাদের আর ব্যবসা চালিয়ে যাওয় সম্ভব হবেনা, কারণ তখন পুরোনো গ্রাহকদের সংখ্যা বেড়ে যাবে।  ঠিক তখনই এরা গা ঢাকা দেবে।  কিন্তু লভ্যাংশ ছাড়া নয়, ‍তখনো এদের হাতে লুটে নেওয়া টাকার পরিমান কয়েকশো কোটির কম থাকবে না। ধরা খাবে অধিকাংশরা রেজিস্টার্ড ফ্রিল্যন্সাররা । বাটপার ডেসটিনির মতোই কৈ-এর তেলে কৈ ভাজে এরা।  সাথে আছে কমিশন সিস্টেম।  নতুন মেম্বার যোগ করতে পারলেই কমিশন। পুরোপুরি বাটপারি।  কোন গর্দভরা যে এদের লাইসেন্স দেয়!

আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হলো আজকাল এদের পক্ষে সাফাই গেয়ে টিভি অনুষ্ঠানও হয়!

এরা আউট সোর্সিয়ের নামে মূলত দেশের তরুনদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। তরুনদের জীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করছে, বিদ্যুতের শ্রাদ্ধ করছে, আর ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের আয়ে কিছু অবদান রাখছে!

এদের এসব কিছু দেখেও না দেখার ভান করে দেশের আইসিটি জগতের নেতৃত্বদানকারী মহীপালরা। এই মহীপালদের একজনের কাছে এই নাদান আমিএই প্রশ্নটাই তুলেছিলাম কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি।(লিংকটি ঘুরে আসুন, মজা পাবেন!)।

আসুন এদের থামাতে আমরা সচেতন হই, তরুনদের কে বোঝাই, এভাবে জীবনের মুল্যবান সময় ও কর্মক্ষমতা নষ্ট না করে, নিজেকে সৃজনশীল ও সম্মানজন কাজে যুক্ত করতে হবে। আয় করতে হবে স্বীকৃত পন্থায়, সম্মানজনক উপায়ে, বাটপারদের পাল্লায় পড়ে জীবনকে ‍উচ্ছনে দেয়ার কোন মানে নাই, নিজের সাথে সাথে অন্যের জীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করারও কোন মানে নাই।