মত প্রকাশের স্বাধীতনা ও হুক্কা-হুয়া মিডিয়া

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রায় সবগুলোরই প্রিন্ট সংস্করণ আমি প্রতিদিন সকাল বেলা দেখে থাকি, কাজের অংশ হিসেবে।

পত্রিকাগুলো যে প্রায় সবই এক শেয়ালের রা, তা আমাদের অজানা নয়। এদের মধ্যে কিছু আছে যারা নিজেদেরকে ‘সুশীল’ দাবী করে। দাবী করে তারা সত্য প্রকাশে আপোষহীন। গতকাল সকালের পত্রিকাগুলো দেখে আমার মনে এই কথাটা ঘুরে ফিরে আসছিল যে- সব শেয়ালের এক রা।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি দাবীকারী এইসব পত্রিকার সম্পাদক-মালিক আসলে আচরণে একেকটা প্রভুভক্ত কুকুরের থেকে কোন অংশে কম নয়। প্রভুর পক্ষে মিথ্যাকে সত্য- সত্যকে মিথ্যার করার জন্য কোরাস গাওয়ার সময় শেয়ালের মতোই হুক্কা-হুয়ায় এরা অদ্বিতীয়। আবার সুবিধা নেওয়ার বেলায় এরা খেক শেয়ালের মতোই ধূর্ত। যুগান্তর এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

যে ডেইলি স্টার কিছুদিন আগে কথিত বাঁশের কেল্লার কোন এক স্ক্রিণশট তৈরি করে প্রথম পাতায় চার কলামের নিউজ করলো যে এরা বাংলাদেশ ভেঙ্গে পাকিস্থানের সাথে মিশে যেতে চায়; নয়তো পাকিস্থান-কাশ্মির-বাংলাদেশ মিলে বাংলাস্তান তৈরি করবে! অথচ এই ডেইলি স্টারই আবার কথিত মুক্তমনা ব্লগারদের নামে ধর্মান্ধদের দ্বারা ধর্মবিদ্বেষী ব্লগ তৈরি করে ওই ব্লগারদের হত্যা-ষড়যন্ত্র পরিকল্পনার কল্পকাহিনী লিখলো ইনিয়ে-বিনিয়ে। ডেইলি স্টারের কাছে বাঁশের কেল্লার স্ক্রিনশটের সত্যতা আছে, ওটা ফেইক নয়; ব্লগারদের ধর্মবিদ্বেষী ব্লগ তাদের লেখা, এটার সত্যতা নেই।

অথচ, ছয়/সাত তারিখের ডেইলি স্টার/প্রথম আলো গংদের দেখুন। তারা মানুষকে বুঝালো যে মাদ্রাসার ছেলেটি সারা জীবন কোরআন শরীফ পড়েছে, কোরআনকে অন্তরে ধারণ করেছে, নিজের জীবনের চেয়ে যে গ্রন্থটির মর্যাদা যার কাছে বহুগুণ বেশী, ওযু ছাড়া যে ছেলেটি ওই গ্রন্থটি স্পর্শ করে না- সেই মাদ্রাসার দাড়ি-টুপি ওয়ালা ছেলেটিই আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে কোরআন শরীফ। আর সম্বস্বরে হুক্কা-হুয়া করে গেল সবগুলো একসাথে। এখানে তারা কন্সপিরেসি থিউরি খুজে পায় নি।

যে হেফাযত এ যাবৎ অর্ধ-শতাধিক সমাবেশ করলো শান্তিপূর্ণভাবে, তারাই নাকি সহিংস হয়ে ওঠলো মতিঝিল চত্বরে এসে। মতিঝিলে আগুন-গুলি-ভাংচুরের ঘটনা সবই নাকি ঘটিয়েছে হেফাযতের কর্মীরা। অথচ, এই লোকগুলি কোরআন শরীফ-হাদীস আর শাদা পায়াজামা-পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য খুব কম জিনিশই জীবনে দেখেছে। এদের অন্ততঃ ৯০ শতাংশ ঢাকা শহরেই এসেছে প্রথম। আর তারাই দেখে দেখে বইয়ের দোকানে, অফিসে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এরা এতোটাই দক্ষ। প্রথম আলো গং বললো, আর আমরাও বিশ্বাস করলাম। লীগের গুন্ডারা যে প্রকাশ্যে গুলি চালালো হেফাযতের মিছিলে, তার ছবিও তাদের ক্যামেরায় ওঠলো না, পত্রিকায়ও আসলো না।

রাতের অন্ধকারে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে যে অভিযান চালানো হলো এইসব পত্রিকার কোনটিতেই তার কোন বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট হলো না।

কেন বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে অভিযান চালানো হয়েছিল?
কেন অভিযানের জন্য রাত আড়াটার সময়কে বেছে নেওয়া হলো?
কতোজন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন সেখানে অংশ নিয়েছে?
কতো পরিমান গোলা-বারুদ ব্যবহৃত হয়ছে?
অভিযানে কতোজন নিহত হলো?

এসব নিয়ে এইসব প্রভুভক্তরা কোন প্রশ্ন তোলেনি। তুলবেও না। বরং আজ উল্টো হুক্কা-হুয়া এসেছে সমকালে- “মৃতের সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচার করা হচ্ছে।”

পত্রিকার দলীয় অবস্থান থাকবেই। এই জায়গার বিরোধীদলের অবস্থা খুবই করুণ। তাদের মিডিয়া বলতে কিছু নেই। বিরোধী দলের মুখপাত্র পত্রিকা সবেধন আমার দেশকে আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য একটি পত্রিকাকে হত্যা করার জন্য তার কোটায় প্রাপ্য সরকারি বিজ্ঞাপন ও নিউজ প্রিন্টের বরাদ্ধ বন্ধ করে দেওয়াই যথেষ্ট। আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে সে ব্যবস্থা আগেই নেওয়া হয়েছিল। তারপরও এটি দাম বাড়িয়ে প্রতিকূল পরিবেশে লড়াই করে টিকে ছিল।

শেষ পর্যন্ত তো সম্পাদককে গ্রেফতার করে প্রেসই সিলগালা করে দিলো। তার আগে বন্ধ করা হয়েছে চ্যানেল ওয়ান। বন্ধ করা হয়েছে ভিন্নমতের ব্লগ সোনার বাংলাদেশ। আমার দেশের পর বন্ধ হলো দিগন্ত আর ইসলামিক টিভি। স্পষ্টতই দেশ একটা ডিক্টেটরশিপের ওপর চলছে। আমরা যা শুনতে পাচ্ছি তা সবই একপক্ষের কথা, অন্যপক্ষের বক্তব্য প্রকাশের রাস্তাটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ভিন্নমতের কথা যা শুনতে পাই, তা কেবল ফেসবুক আর ব্লগেই সীমাবদ্ধ। ফেসবুক-ব্লগে মোট জনসংখ্যার খুব কম মানুষেরই অ্যাকসেস আছে। সেখানেও এখন নিয়ন্ত্রণ চলছে। স্বাধীন মত প্রকাশ এখন আর নির্ভয়ের ব্যাপার নয়; যে কেউ ইলিয়াস আলীর মতো গুম হয়ে যেতে পারে যে কোন সময়।

কোন পত্রিকায়ই শতভাগ নিরপেক্ষ সংবাদ দেয় না। বিরোধী দলের মুখপাত্র পত্রিকা সবেধন আমার দেশও সব ক্ষেত্রে সঠিক সংবাদ করতো না। কিন্তু ভিন্নমত থাকলে দুই পক্ষের কথা থেকে পাঠক অন্ততঃ দুটো অবস্থানের মধ্যেকার সত্যটা অনুধাবন করার সুযোগ পায়। সেইটিরই এখন সবচেয়ে বড় অভাব।

সংবাদে পক্ষপাতিত্ব থাকবেই। তারপরও দেশ ও জাতির কাছে দায়বদ্ধতা বলে তো একটা কথা আছে। সেই জায়গায় এইসব হুক্কা-হুয়ারা কতোটুকু যেতে পেরেছে দলীয় প্রভুভক্তিকে ছাপিয়ে?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s