প্রতিদিনের জীবনের একদিন

রিকশা থেকে নেমে প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়স্ক রিকশাওয়ালা চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাড়া কতো দেবো?

তিনি বললেন, ’আপনে ইনসাফ কইরা দেন।’

বর্ষার এই খামখেয়ালি বৃষ্টিতে ভিজে তিনি রিক্সা চালিয়ে আমাকে শুক্রাবাদ হতে কারওয়ান বাজার মোড় পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। আমি যখন রিক্সায় বসে পলিথিন কাগজের ভেতরে নিজেকে বৃষ্টির ঝাপটা হতে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম, তিনি তখন বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে যানজট এড়িয়ে রিক্সার প্যাডেল ঘুড়িছেন। তার মাথা বা শরীর কোথাওই কোন বৃষ্টি নিবারক রেইনকোট কিংবা পলিথিনের কোন আবরণ ছিল না। রিক্সায় ওঠেই ব্যাপারটা খেয়াল হলো। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, বৃষ্টি থেকে আপনার মাথা ও শরীর ঢাকার কোন ব্যবস্থা করেন নি কেন? উত্তরে তিনি বললেন, ’বৃষ্টিতে আমার কিছু অয় না। আমি বৃষ্টিতে ভিজ্যা পাট কাটছি, ধান কাটছি। আমার কোন সময় কিছু অয় নাই, কোন দিন ওষুধও কিন্যা খাই নাই।’ এইসব খেয়ে খাওয়া মানুষ কষ্ট সহিষ্ণু। তাদের আদতেই রোগ ব্যধিতে আক্রান্ত হলে চলেনা। বৃষ্টিতে তার সাথে আলাপ তেমন 
জমলো না। তবে তিনি জানালেন, তিনি ঢাকায় রিক্সা চালাচ্ছেন প্রায় পঁচিশ ছাব্বিশ বছর ধরে।

বৃষ্টি পড়ছিল তার মাথায়, শরীরে। শুক্রাবাদ হতে কারওয়ান বাজারে সোনার গাঁ প্রান্তে আসতে আসতে আমি যেখানে রিক্সার ভেতরে বসে অর্ধেক ভিজে গেছি, তখন তার আর ভেজার কিছু বাকি ছিল না। আমি রিক্সায় বসে কাঁদাজল এড়িয়ে আরামে আমার গন্তব্যে এসে গিয়েছি। আমার এই আরামে আসার জন্য পঞ্চাশ কি তারও বেশী বয়সী লোকটিকে বৃষ্টিতে ভিজে রিক্সা চালাতে হয়েছে। এই বৃষ্টি ভেজার কারণে লোকটির সর্দি লাগতে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জা হতে পারে। এমনকি তার কিডনি পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন তাকে রিক্সা চালানো বাদ দিয়ে ঘরে বসে থাকতে হতে পারে। ওষুধ কেনার জন্য টাকা লাগতে পারে। তার ওপর নির্ভরশীর তার পরিবারের সদস্যদের না খেয়ে থাকতে হতে পারে। আমি অনেক কিছুই ভাবছি। আমি জানি এতোসব কিছুর দায়-দায়িত্ব আমি নেবো না, নেওয়ার ক্ষমতাও আমার নেই।

সকাল বেল যখন অফিসের উদ্দেশ্যে বের হই তখন জ্বলজ্বলে রোদ ছিল। বৃষ্টি হতে পারে এটা ঘুর্ণাক্ষরেও মাথায় আসেনি। হাতে করে ছাতাটা নিয়ে আসার প্রয়োজনটা তখন অনুভব করিনি। মিরপুর রোডের টেকনিক্যাল মোড় থেকে আজ জ্যাম শুরু হয়েছে। মানিক মিয়া এভিনিউয়ের আড়ং সিগনাল পর্যন্ত একই রকম জ্যাম। টেকনিক্যাল মোড় থেকে আসাদগেট পার হতেই পঞ্চাশ মিনিট লেগে গেল। হরতালের পরের দিন হিসেবে অবশ্য এটা একটা কাঙ্খিত ব্যাপার। বাস আসাদগেট পর্যন্ত যতক্ষণে পৌঁছালো ততক্ষনে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। শুক্রাবাদ এসে বাস থেকে নেমে পরের বাস ধরার জন্য দাঁড়ালাম একটা গাছের নীচে। বিশ মিনিট পরেও যখন বাস এলো না তখন সিদ্ধান্ত বদলাতে হলো। ভাবলাম আজ রিক্সায়ই যাই। ততোক্ষণে আমি অনেকটাই ভিজে গিয়েছি।

মাসের শেষ। প্রতিমাসের মতোই এ মাসেও আগের মাসে হাতে পাওয়া বেতনের প্রায় সবটাই বিভিন্ন খাতে খরচ হয়ে গেছে। পৃথিবীর সব দেশেই আয়ের সাথে ব্য়য়ের একটা সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশে তা নেই। পকেটে বাস ভাড়া দেওয়ার মতো পয়সা ছাড়া তেমন টাকা পয়সা নেই। ভাড়া কতো দেবো তা নিয়ে একটা দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে গেলাম। কতো ভাড়া দেওয়া উচিত? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ’বিশ টেকা দেন।’ সম্ভবত ১৫ টাকা এখানকার স্বাভাবিক রিক্সাভাড়া। কিংবা ২০ টাকাও হতে পারে। ২০ টাকা স্বাভাবিক ভাড়ার পথ বৃষ্টিতে ভিজে পেরোনোর পর ২০ টাকা ভাড়া চাওয়ার মানে লোকটি হাবাগোবা। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মতো চতুর নয়। তার হাতে ২০ টাকার নোটের সাথে আরো একটা দশ টাকার নোট ধরিয়ে দিলাম। আমি জানি এটা কিছুই না। তবুও মনকে মিথ্যে শান্তনা দেওয়া আরকি।

গত সপ্তাহে প্রায় একই রকম পরিস্থিতিতে পড়ে রিক্সায় চড়তে হয়েছিল। বাংলা মোটর মোড় হতে কোন তরুন রিক্সাচালকই আমার গন্তব্য আবুজর গিফারী কলেজে যেতে রাজি হলো না। মগবাজার মোড়ে পৌঁছালাম দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে। তারপর এক পঞ্চাশোর্ধ রিক্সাচালককে পেলাম ‍যিনি আমার গন্তব্যে যেতে রাজি হলেন। তার গাঁয়ে অবশ্য স্কচটেপ দিয়ে জোড়াতালি লাগানো একটা রেইনকোট পড়া ছিল। কেউ হয়তো দয়া করে দান করেছে। তখনো থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছিল। বলা বহুল্য ওই কলেজে ওটাই ছিল আমার প্রথম যাওয়া এবং সেটা বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য। রাস্তা সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল 
না। চালক যতোই এগিয়ে যাচ্ছিলেন, আমি ততোটাই আৎকে ওঠছিলাম। সামান্য বৃষ্টির পানিতে রাস্তা তলিয়ে গেছে। পানির ওপর ভেসে ওঠেছে মনুষ্য বর্জ্য, আবর্জনা। ববহুকষ্টে এসব ঠেলেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। বুঝতে পারলাম কেন অন্যান্য রিক্সা চালকরা এদিকে আসতে চায়নি।

গন্তব্যে গিয়ে রিক্সা চালককে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা ভাড়া কতো দেবো? তিনি পঞ্চাশ টাকা চাইলেন। আমি বিনাবাক্যে তাকে পঞ্চাশ টাকাই দিলাম। ভাড়াটা দিয়ে আমি হয়তো মনে মনে একটু তৃপ্তিই পেলাম। কিন্তু বাস্তবে আমি জানিনা চুলপাকা এই পঞ্চাশ কিংবা ষাটোর্ধ রিক্সাচালকের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কতো। তার সংসার কিভাবে চলে। তিনি তিন বেলা ঠিক মতো খেতে পারেন কিনা। তার পরিবারের মৌলিক চাঁহিদা তার উপার্জনে মেটানো যায় কিনা।

আমি জানিনা আজকের রিক্সা চালকের সংসারে কে কে আছেন। তার আয় তার জন্য যথেষ্ট কিনা। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর একটা কাজে লেগে থাকা মানে তিনি তার জীবনের অনেকটা সময় তার পেশার মধ্যে দিয়ে মানুষকে সেবা দিয়েছেন। যারা তার রিক্সায় চড়েছেন, তারা আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণী। আশির দশকে যিনি উচ্চ মধ্যবিত্ত ছিলেন, কিংবা মধ্যবিত্ত ছিলেন, তাদের অবস্থা নিশ্চয়ই অনেক উন্নতি হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো উচ্চ বিত্ত হয়েছেন। গাড়ি-বাড়ি করেছেন। কিন্তু প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর ধরে একটা পেশায় যে মানুষটি লেগে আছেন, দেশকে সেবা দিয়েছেন, জীবনের সাথে যুদ্ধ করেছেন- তার কোন উন্নতির ব্যবস্থা এই দেশের সমাজ-ব্যবস্থা, রাষ্ট্র করতে পারেনি।

প্রতিদিনই অনেক মানুষকে ঢাকার রাস্তায় ফুটপাতে শুয়ে থাকতে দেখি। দেশে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে। অন্যদিকে সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠছে রাজনৈতিক নেতাদের।

দেশটা কি এজন্যই স্বাধীন হয়েছিল?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s