আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারণার ফাঁদে তরুণরা

আউটসোর্সিংয়ের নামে  প্রতারণা চলছে দেশে। ডিজিটাল প্রতারণা।  ডোল্যান্সার, স্কাইল্যান্সার, বিডিএস ক্লিক সেন্টার- আরো হরেক নাম। কাজ একটাই- তরুণদেরকে কথিত আউটসোসিংয়ের মাধ্যমে আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকা তুলে নেওয়া।

আউট সোর্সিং-এর নামে এই যে হরেকনামের কতগুলো ভূঁইফুর কম্পানি দেশে তরুণদের তথাকথিত আয় করার সুযোগ করে দিচ্ছে তা মূলতঃ আরেকধরনের এমএলএম জাতীয় পিটিসি উৎপাত। পালের গোদা ডোল্যান্সার। গত বছর এদের আবির্ভাব ঘটে। এদের দেখাদেখি স্কাইলান্সার, বিডিএস ক্লিক সেন্টার আরো অনেক নামে এদের বাটপারি শুরু হয়েছে। এদের তথাকথিত আউট সোর্সিং বলতে বুঝায় একাউন্টপ্রতি দিনের মূল্যবান সময়ের ২/৩ ঘন্টা বসে বসে ক্লিক বাজি করা।  ১০০ ক্লিকের বিনিময়ে কথিত ১ ডলার দেবে তারা।(এক ডলারের মূল্যমান এদের মার্কেটে ৭৫ টাকা, ডলার কোন অ্যাকাউন্ট যোগ হবে না, আনতে হবে তাদের কাছ থেকেই!)। আর এই ক্লিকবাজি করতে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে সাত হাজার টাকা দিয়ে! কিন্তু আমরা জানি মাথায় কিছু থাকলে কাউকে কোন টাকা পয়সা না দিয়েই আউট সোর্সিং করা যায়!

সারামাস এদের ক্লিকবাজি করে পাওয়া যাবে একাউন্টপ্রতি ৩০ ডলার বা ২১০০ টাকা।  তা থেকে বাদ দিতে হবে ১৫% ভ্যাট ও একমাসের ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ বিল। আর এর পেছনে হুমড়ি খেয়ে ছুটছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা। অনেকে ২/৩টি অ্যাকাউন্ট নিয়ে দিন-রাত ক্লিক নিয়ে পড়ে থাকে। পড়াশোনা উচ্ছনে যাচ্ছে।

এতোকিছুর পরেও এদেরকে মেনে নেওয়া যেতো যদি এরা এক পয়সাও বিদেশ হতে আউট সোর্সিং করে দেশে আনতো। এরা যে ক্লিক দেওয়াচ্ছে তা মূলত এদেরই ভাড়া করা সাইট। এই ক্লিকবাজিতে কানাকড়িও বিদেশ হতে দেশে আসে না। তাহলে এদের টাকার উত্স কি?

এরা রেজিস্ট্রেশনের জন্য একাউন্টপ্রতি সাত হাজার করে টাকা নেয়। আর এদের আাসল তেলেসমাতি এখানেই!

সহজ হিসবাটা হচ্ছে এরকম: ২৫ এপ্রিল, ২০১২ তারিখ পর্যন্ত শুধু মাত্র ডোল্যন্সারেরই রেজিস্টার্ড গ্রাহকের সংখ্যা ২ লক্ষ ৭৮ হাজার ৭৫ জন।  প্রতিজনকে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য দিতে হয়েছে ১০০ ডলার (৭,৫০০ টাকা)।  তাহলে ২৭৮০৭৫×১০০= ২ কোটি ৭৮ লক্ষ ৭ হাজার ৫০০ ডলার বা ২৭৮০৭৫০০×৭৫= ২০৮ কোটি ৫৫ লক্ষ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা তারা ইতিমধ্যে হাতিয়ে নিয়েছে। এদের ওয়েব পেজে দেওয়া তথ্য মতে (আল্লাহ-ই জানে এ তথ্য কতোখানি সত্য) এ যাবৎ তারা তাদের ফ্রিল্যানসারদের আয় হিসেবে দিয়েছে ১৯ লক্ষ ৬৮ হাজার ৭৬২ ডলার বা ১৯৬৮৭৬২×৭৫= ১৪৭ কোটি ৬৫ লক্ষ ৭ হাজার ১৫০ টাকা।  এই কোম্পানির বয়স এখন এক বছর এবং এই এক বছরেই তাদের দেওয়া হিসাব মতেই তাদের হাতে এখনো পর্যন্ত নিট বাটপারি লাভ আছে ২০৮,৫৫;৬২,৫০০-১৪৭,৬৫,৭,১৫০= ১৯৩ কোটি ৭৯ লক্ষ ৫ হাজার ৩৫০ টাকা।

এভাবেই লুটপাট হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ। আগামী একবছর পরে যখন এদের গ্রাহক সংখ্যা আরো কয়েকগুন বেড়ে যাবে তখন তাদের আর ব্যবসা চালিয়ে যাওয় সম্ভব হবেনা, কারণ তখন পুরোনো গ্রাহকদের সংখ্যা বেড়ে যাবে।  ঠিক তখনই এরা গা ঢাকা দেবে।  কিন্তু লভ্যাংশ ছাড়া নয়, ‍তখনো এদের হাতে লুটে নেওয়া টাকার পরিমান কয়েকশো কোটির কম থাকবে না। ধরা খাবে অধিকাংশরা রেজিস্টার্ড ফ্রিল্যন্সাররা । বাটপার ডেসটিনির মতোই কৈ-এর তেলে কৈ ভাজে এরা।  সাথে আছে কমিশন সিস্টেম।  নতুন মেম্বার যোগ করতে পারলেই কমিশন। পুরোপুরি বাটপারি।  কোন গর্দভরা যে এদের লাইসেন্স দেয়!

আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হলো আজকাল এদের পক্ষে সাফাই গেয়ে টিভি অনুষ্ঠানও হয়!

এরা আউট সোর্সিয়ের নামে মূলত দেশের তরুনদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। তরুনদের জীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করছে, বিদ্যুতের শ্রাদ্ধ করছে, আর ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের আয়ে কিছু অবদান রাখছে!

এদের এসব কিছু দেখেও না দেখার ভান করে দেশের আইসিটি জগতের নেতৃত্বদানকারী মহীপালরা। এই মহীপালদের একজনের কাছে এই নাদান আমিএই প্রশ্নটাই তুলেছিলাম কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি।(লিংকটি ঘুরে আসুন, মজা পাবেন!)।

আসুন এদের থামাতে আমরা সচেতন হই, তরুনদের কে বোঝাই, এভাবে জীবনের মুল্যবান সময় ও কর্মক্ষমতা নষ্ট না করে, নিজেকে সৃজনশীল ও সম্মানজন কাজে যুক্ত করতে হবে। আয় করতে হবে স্বীকৃত পন্থায়, সম্মানজনক উপায়ে, বাটপারদের পাল্লায় পড়ে জীবনকে ‍উচ্ছনে দেয়ার কোন মানে নাই, নিজের সাথে সাথে অন্যের জীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করারও কোন মানে নাই।

অভ্র-বিজয় বিতর্ক: কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে বাংলা লেখার কমন প্লাটফর্ম কবে হবে?

ব্লগে ব্লগে এখন তুমুল বিতর্ক চলছে অভ্র আর বিজয় নিয়ে। জাতি হিসেবে যে আমরা সব দিক দিয়েই বিভক্ত তার নজির বহু আগে থেকেই আমাদের কম্পিউটারের বর্ণমালায়ও যুক্ত হয়েছে। কম্পিউটারের কীবোর্ডের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে বিজয়ের প্রথম প্রকাশেরও অন্ততঃ এক দশক পরে। তখন কম্পিউটারে বাংলা লেখার মাধ্যম বলতে আমার মতো নবীন ব্যবহারকারীরা বিজয়কেই জানতো। শুরুতে কম্পিউটারে বাংলা লেখা আর ওয়েব পেজে বাংলা দেখার ইতিহাসটা খুব মসৃণ ছিলোনা। আমরা যে আজ সমৃদ্ধ সামহোয়ারইন ব্লগ বা উইকিপিডিয়া বাংলা সাইট, প্রায় সকল বাংলা পত্রিকার অতি চমৎকার অনলাইন সংস্করণ দেখতে পাই, এক দশক আগেও এসবের এমন সরব উপস্থিতি ছিলো না। তাই তখনো বাংলায় ওয়েব পেজ ডিজাইন খুব প্রচলিত ছিলো না। আসকি-আনসি, ইসকি-ডিওই আর সুমিত প্রভৃতি কোডের প্যাঁচগোছের কারণে তখন বাংলায় ওয়েব পেজ ডিজাইন যেমন খুব সহজ ছিলোনা, তেমনি এসব কোডিং-এর ফন্ট দিয়ে ডিজাইন করা ওয়েব পেজ সকল পিসিতে সঠিকভাবে দেখাও যেতো না।

বাংলায় মেইল করতে হলে ফাইলকে এটাচমেন্ট হিসেবে পাঠিয়ে যে ফন্টে লেখা হয়েছে তার একটা কপিও যুক্ত করা লাগতো সেই মেইলের সাথে! সারা দুনিয়ার ভাষার বর্ণমালার জন্য একটা স্টান্ডার্ড কোডিং মান ইউনিকোড-এ বাংলা ফন্ট যুক্ত হবার পর ধীরে ধীরে সেই ঝামেলা পেরিয়ে আজ অনেক চমৎকার বাংলা ওয়েব পেজ তৈরি হচ্ছে, আমরা পেয়েছি আন্তর্জাতিক মানের অতি চমৎকার অনেক বাংলা ওয়েব পেজ। এখনো উন্নতি হচ্ছে ইউনিকোড এনকোডিং মানের। সেই সাথে উন্নতি হচ্ছে অপারেটিং সিস্টেমের। মাইক্রোসফটের উইনডোজ এক্সপি অপারেটিং সিস্টেমে ডিফল্ট উইনডোজ সেটিংসে বাংলা ওয়েব পেজ দেখার ব্যবস্থা ছিলোনা। এজন্য আলাদা কমপ্লেক্স স্ক্রিপ্ট ইনস্টল করতে হতো। কিন্তু মাইক্রোসফট তার সর্বশেষ অপারেটিং সিস্টেম উইনডোজ সেভেন-এ বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। কোনপ্রকার কনফিগারেশনের পরিবর্তন না করেও ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ৮ ব্যবহার করে ওয়েব পেজে অনেক চমৎকার বাংলা দেখা যায় উইনডোজ সেভেন অপারেটিং সিস্টেমে। প্রযুক্তির এই যে উৎকর্ষতা তা অনেক বন্ধুর পথ পেরিয়ে আজ এ পর্যন্ত এসেছে।

কম্পউটারে বাংলা লেখার ইতিহাস খুব বেশী দিনের না হলেও খুব কম সময়ের না। অবশ্য কম্পউটারে বাংলা লেখার সফটওয়্যার তৈরি হওয়ার বহু আগে ১৯৬৯ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী ‘মুনীর কীবোর্ড’ নামক একটি বাংলা টাইপ রাইটার কীবোর্ড উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে এই কীবোর্ডের লে-আউট ব্যবহার করে কম্পিউটারে বাংলা লেখার সফটয়্যারও তৈরি হয়েছে। দুই দশক পেরিয়ে গেছে কম্পিউটারে বাংলা যুক্ত হয়েছে। তবুও কম্পিউটারে বাংলা লেখার ইতিহাসটা কখনোই কিন্তু মসৃণ হয়নি। দুই দশক পেরিয়ে এসেও বাংলা লেখার কীবোর্ড ইস্যুতে জাতীয় অন্যান্য ইস্যুর মতো এখানেও আমরা বহু ধারায় বিভক্ত। কম্পিউটারে যখন বাংলা লেখার শুরু হয় তখন এর জন্য একটা কমন প্লাটফর্ম তৈরি না করে যে যেভাবে পেরেছেন কীবোর্ড লে-আউট ডিজাইন করেছেন। যে যার সুবিধামতো এনকোডিং ব্যবহার করে কীবোর্ড আর ফন্টের প্রোগ্রামিং করেছেন। ফলে যা হবার তা-ই হয়েছে। মুনীর কীবোর্ড, সত্যজিৎ কীবোর্ড, গীতাঞ্জলী কীবোর্ড, শহীদ কীবোর্ড, বসুন্ধরা কীবোর্ড, লেখনী কীবোর্ড, বিজয় কীবোর্ড, ন্যাশনাল কীবোর্ড, অভ্র কীবোর্ড এবং অধুনা রোকেয়া কীবোর্ড- প্রভৃতি কীবোর্ড লে- আউট পেয়েছি অনেক, সেই সাথে ঝামেলাও পেয়েছি অনেক।

আজ অবধি বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা লেখার কোন কমন বা সাধারণ প্লাটফর্ম তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের ব্যবহারকারীরা এক কীবোর্ড ব্যবহার করেন তো, ভারতের বাংলাভাষী ব্যবহার কারীরা অন্যটি। ওপেন সোর্স অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স ছাড়া মাইক্রোসফটের উইনডোজ সেভেনের আগ পর্যন্ত কোন অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা লেখার ডিফল্ট কোন কীবোর্ড যুক্ত হয়নি। উইনডোজ সেভেনে বাংলা লেখার দুইটি কীবোর্ড যুক্ত হয়েছে, একটি আমাদের ন্যাশনাল কীবোর্ড অন্যটি ভারতীয় বাংলা কীবোর্ড।

জব্বার সাহেবের কৌশলী কার্যক্রমের কারণেই হোক আর ব্যবহারে সুবিধার কারণেই হোক বাংলাদেশে কীবোর্ড ব্যবহারের দিক দিয়ে বিজয় সবচেয়ে এগিয়ে। কয়েকদিন আগে একজন ব্লগার জানলেন ১৯৯৮ সালে মাইক্রোসফট কর্মকর্তারা বাংলাদেশে এসেছিলেন তাদের অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা কীবোর্ড যুক্ত কারার জন্য। কিন্তু জব্বার সাহেব তার প্রভাব ও কানেকশনকে কাজে লাগিয়ে মাইক্রোসফটের সেই প্রচেষ্টাকে আটকে দেন (তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলো তারপ্রতি সহানুভূতিশীল এখনকার সরকার দল)। কারণ তখন সরকারি অফিসে লেখনী আর মুনীর ব্যবহার হতো যা ছিলো কারো ব্যক্তিগত স্বত্ব বিহীন। যদি সে সময়ে মুনীর বা লেখনীর কোন একটি কীবোর্ড উইনডোজ অপারেটিং সিস্টেমে যুক্ত হতো তাহলে আমরা আজেকে যে বিজয়ে একচেটিয়া ব্যবহার দেখতে পাচ্ছি, সেই জায়গাটি হয়তো দখল করতো সেই কীবোর্ড। মোস্তফা জব্বার সাহেব তখন সেটি হতে দেননি কারণ তাতে তার বিজয় লে-আউটের কীবোর্ড সফটয়্যার ব্যবসায় মার খাবার সম্ভাবনা ছিলো। শেষে মাইক্রোসফট বাংলাদেশ ছাড়ে এই বলে যে তোমরা আগে সিদ্ধান্ত নাও কোনটি ব্যবহার করবে, তারপর আমরা তোমাদের কীবোর্ড উইনডোজে যোগ করবো ।

আজও আমাদেরকে কম্পিউটারে বাংলা লিখতে হয় অভ্র বা বিজয় জাতীয় কোন থার্ড পার্টি কোন সফটয়্যার ব্যবহার করে । যদিও বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বুয়েট কর্তৃক উদ্ভাবিত ন্যাশনাল কীবোর্ডের (যা শুরু থেকে ইউনিকোড সমর্থন করে, উল্লেখ্য বিজয় ইউনিকোড সমর্থন করে মাত্র ২০০৫ সাল হতে) দুইটি সংস্করণ এ যাবৎ প্রমিত করেছে এবং মাইক্রোসফটের অপারেটিং সিস্টেম উইনডোজ সেভেন-এ এই ন্যাশনাল কীবোর্ড ডিফল্ট বাংলা কীবোর্ড হিসেবে যুক্ত হয়েছে, তবুও এর ব্যবহার হয়না বল্লেই চলে। ন্যাশনাল কীবোর্ড সম্পর্কে কতোজন মানুষ জানেন তাও সন্দেহের বিষয়। এর কারণ কীবোর্ড ব্যবহার একটি অভ্যাসের বিষয়। মানুষ যেটিতে একবার অভ্যস্ত হয়ে যায় তা থেকে বের হয়ে কেউ নিশ্চয়ই আবার আরেকটা কীবোর্ড লে-আউট মুখাস্ত করবেন না ।

এ প্রসঙ্গে বোরাক (DVORAK) কীবোর্ডের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ইংরেজি QWERTY কীবোর্ড বাজারে আসার অনেক পরে ১৯৩২ সালে বাজারে আসে বোরাক কীবোর্ড। বলা হয়ে থাকে বোরাক কীবোর্ড, কোয়ার্টি কীবোর্ড অপেক্ষা অনেক বেশী দক্ষতা সম্পন্ন, কিন্তু বোরাক তখন আর জনপ্রিয়তা পায়নি। কারণ ততোদিনে কোয়ার্টিতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো (তথ্য সুত্র: টাইপিং টিউটর সফটয়্যার: Ten Thumbs Typing tutor)। আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো অন্য কোন কীবোর্ড তৈরি ও তার নিয়মিত আপডেট হয়নি বা অন্যান্য কীবোর্ড পৃষ্ঠপোষকতাও পায়নি। এজন্যই বিজয় জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা এতোদিনে বিজয়ের সাথে অভ্যস্থ হয়ে গেছে। কম্পিউটারের খুটিনাটি বিষয়ে ব্যাপক ধারণা রাখেন- এমন কম্পিউটার ব্যবহারকারী ছাড়া খুব কম ইউজারই বাংলা লেখার জন্য বিজয় ব্যতীত অভ্র বা অন্যান্য সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। তাই এর ব্যবহার আসলেই একচেটিয়া। আর মানুষের এই অভ্যস্ততাকে পুঁজি করে ব্যবসা করে যাচ্ছেন মোস্তফা জব্বার। উইনডোজ সেভেন ৬৪ বিট অপারেটিং সিস্টেমে লেখার জন্য বিজয় একুশে ছাড়া প্রাথমিকভাবে অন্য কোন সফটওয়্যার কাজ করতো না। তিনি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিজয় একুশে সফটওয়্যার-এর দাম নির্ধারণ করেছেন পাঁচ হাজার টাকা! জব্বার সাহেব সত্যিই একজন প্রকৃত বর্ণমালা ব্যবসায়ী! পৃথিবীর আর কোন ভাষা কম্পিউটারে লেখার জন্য এমন থার্ড পার্টি সফটয়্যার ব্যবহার করতে হয় কি-না আমার জানা নেই। তবে না থাকার সম্ভাবনাই বেশী। তবে সেক্ষেত্রে নিজেদের ভাষা কম্পিউটারে লেখার জন্য থার্ড পার্টি সফটয়্যার ব্যবহারের একমাত্র কৃতিত্ব আমাদের ই আছে!

মোস্তফা জব্বার সাহেব দাবী করেছেন তার ডিজাইনকৃত বিজয় কীবোর্ডের নকশা বা লে-আউট নাকি হুবহু অনুকরণ করা হয়েছে অভ্রর ইউনিজয় অংশে। তার দাবী কতোখানি যেীক্তিক বা অযেীক্তিক সেই প্রসঙ্গে আমি যাবো না। আমি মনেকরি ইউনিজয় আর বিজয় নিয়ে এখন ঝগড়া না করে সময় এসেছে কম্পিউটারে বাংলা লেখার একটা কমন এবং ওপেন সোর্স প্লাটফর্ম তৈরি করার এবং এটা আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই করতে হবে। অভ্র একটা ওপেন সোর্স প্লাটফর্ম বটে; কিন্তু ইংরেজি বর্ণের অনুকরণে ফোনেটিকের সাহায্যে বাংলা লেখা মূলত একটা অস্থায়ী সমাধান। নিজস্ব বর্ণমালা থাকতে অন্যভাষার বর্ণের অনুকরণে ফোনেটিকে লেখাটা লজ্জারও বটে। তবুও অভ্রকে ছোট করে দেখবার সুযোগ নেই। কারণ অভ্র একজন বর্ণমালা ব্যবসায়ীর হাত থেকে রেহাই দিয়েছে অনেক কম্পিউটার ব্যবহারকারীকে। সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা যেহেতু বিজয় লে- আউটে টাইপ করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, তাই মোস্তফা জব্বার সাহেব চাইবেন তার বিজয়ে স্বত্ব ধরে রেখে একচেটিয়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে। আর আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে বাংলা কীবোর্ডকে একটি সম্মিলিত সাধারণ প্লাটফর্ম দেওয়ার জন্য যাতে আগামী প্রজন্ম এই বহুবিধ কীবোর্ডের ঝামেলা হতে মু্ক্তি পেতে পারে। একটি সভ্য জাতির ভাষা লেখার জন্য একাধিক কীবোর্ড লে আউট কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আজ যদি শহীদ মুনীর চৌধুরি বেঁচে থাকতেন তাহলে কম্পিউটারে বাংলা লেখার ইতিহাসটা অন্যরকমও হতে পারতো। কিন্তু সেটা হয়নি। মহীরুহ ব্যক্তিত্ব অকালে পৃথিবীত থেকে হারিয়ে যান। আর সাধারণের মধ্যে থেকে ওঠে আসা দু’ একজন যদিও মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার জন্য কোন একটি অসাধারণ কাজ করেও ফেলে- শুধু ব্যবসায়িক বা ব্যাক্তিস্বার্থের কারণে সে-ই জায়গাটায় পৌছাতে পারেন না। জব্বার সাহেব বোধহয় তাদের মধ্যে একজন। আজ যে বিজয় নিয়ে তার এত গর্ব, এতো অহংকার সেই বিজয়ের লে-আউটের ডিজাইনের পেছনে রয়েছে পূর্ববর্তী মুনীর কীবোর্ডের অবদান, রয়েছে বিজয় প্রকল্পে কাজ করা অনেক ব্যাক্তির অবদান। বিজয়ের প্রথম সংস্করণের প্রোগ্রমিং করে দিয়েছিলেন দেবেন্দ্র জোশী নামক একজন ভারতীয়, পরবর্তীতে বিজয় প্রোগ্রামিং করেন গোলাম ফারুক আহমেদ, নিয়াজ আহমেদ, মনিরুল আবেদিন পাপ্পন্, কামরুজ্জামান, হোসনে আরা চৌধুরি, মহফুজুর রহমান মাসুম সহ আরো অনেকে। এছাড়াও ফন্ট ডিজাইন ও ডিজিটাইজিং সহ অন্যান্য অনেক কাজে একটি বিশাল কর্মী বাহিনী কাজ করেছেন (মোস্তফা জব্বারের বিজয় গাইড দ্রষ্টব্য)। জব্বার সাহেব যেটি করেছেন তা হলো কোয়ার্টি কীবোর্ডের অনুকরণে বাংলা কীবোর্ডের একটা লে-আউট সাজিয়েছেন এবং এই কীবোর্ডের সফটয়্যার তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একটি কীবোর্ডের নকশা করা আর সেই কীবোর্ডের প্রোগ্রামিং কোনভাবেই এক বিষয় নয়। 

বস্তুতঃ বিজয় উদ্ভাবনে আমি তার অবদানকে কোনভাবেই ছোট করে দেখছিনা, একই সাথে বলতে চাই বিজয় কোনভাবেই তার একক সৃস্টি নয়। এটি একটি সম্মিলিত প্রয়াসের ফসল যার পুরোটা কৃতিত্ব তিনি একাই দাবি করছেন, নিজের নামে পেটেন্ট নিয়েছেন, দুই দশক ধরে ব্যবসাও করেছেন, বিজয় তার নেতৃত্বে উদ্ভাবিত হয়েছে, তাই ব্যবসা করার অধিকারও তার আছে— তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। শুধু একটা লে-আউট ডিজাইন করে জব্বার সাহেব একাই কীবোর্ডের পেটেন্টের মালিক, সমস্ত স্তত্ব তার একার, আর যিনি বা যারা প্রোগ্রামিং করলেন তাদের নামগন্ধও নেই কোথাও। আমি মনেকরি মোস্তফা জব্বারের আরো অনেক আগেই বানিজিৎক মনোভাব বাদ দিয়ে সাধারণের জন্য বিজয়কে উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত ছিলো। সেক্ষেত্রে বিজয় জাতীয় কীবোর্ডের মর্যাদা পেতেও পারতো। এখনো যে সে সুযোগ নেই তা-ও কিন্তু নয়। কিন্তু তার বিজয়ের লে-আউটের একটা অংশ ব্যবহার করে অভ্র-এর ইউনিজয় সফটয়্যার লেখা হয়েছে বলে তিনি যেভাবে হুংকার দিয়ে যাচ্ছেন, তাতে কি তিনি আদৌ বিজয়কে উন্মুক্ত করে দেবেন বলে মনে হয়?

আমি আগেই বলেছি কীবোর্ড একটা অভ্যাসের বিষয়। মানুষ যাতে একবার অভ্যস্ত হয়ে যায়, সেটা থেকে বের হয়ে অন্য একটা কীবোর্ড কেউ ই মুখাস্ত করতে চাইবে না। বিজয় কীবোর্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি চন্দ্রবিন্দু, বিসর্গ, এবং খন্ড ত- এই তিনটি বর্ণ ছাড়া অন্যসব বর্ণই ইংরেজি কোয়ার্টি কীবোর্ডের ইংরেজি বর্ণমালার বোতাম ব্যবহার করে লেখা যায় তথা টাচ টাইপিংয়ের জন্য আদর্শ কীবোর্ড। ন্যাশনাল কীবোর্ডে বাংলা লেখার সময় ইংরেজি বর্ণমালার বিরাম চিহ্ন ব্যবহার করা যায় না। বিজয়ে সে অসুবিধা নেই। সেদিক থেকে বিজয় সবচেয়ে বিজ্ঞান সম্মত কীবোর্ডও বলা যায়। ইউনিজয় বা বিজয় যা- ই বলি না কেন আমরা অনেকেই কিন্তু এই লে- আউটে টাইপ করে অভ্যস্ত। তাই যদি বিজয় বা ইউনিজয় জাতীয় কীবোর্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তাহলে তা ডিফল্ট বাংলা কীবোর্ড হিসেবে যুক্ত হতে পারে মাইক্রোসফটের পরবর্তী অপারেটিং সিস্টেম উইনডোজ এইট-এ। আমরা মুক্ত হবো বাংলা লেখার জন্য থার্ড পার্টি সফটয়্যার ব্যবহারের ঝামেলা থেকে। পরবর্তী জেনারেশন মু্ক্ত হবে একটি অভিশাপ থেকে। মোস্তফা জব্বার কি পারবেন তার ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হতে? তিনি কি চাইবেন না তার নাম ইতিহাসে একজন বর্ণমালা বনিক হিসেবে নয়, বরং বাংলা লেখার জন্য উন্মুক্ত কীবোর্ডের উদ্ভাবক হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাক? 

আরো কিছু কথা:

যদিও ন্যাশনাল কীবোর্ড নামে বাংলা লেখার কীবোর্ড সরকার কর্তৃক প্রমিত করা হয়েছে, তথাপি এর ব্যবহার খুবই সীমিত, অথবা নেই বল্লেই চলে। আপনারা কেউ কি লক্ষ্য করেছেন ঈদানিং নকিয়াসহ বিভিন্ন ব্রান্ডের স্মার্টফোন তৈরি হচ্ছে ইংরেজি কোয়ার্টি কীবোর্ড ব্যবহার করে? যেমন নকিায় ই সিরিজের ই৭১, ই৭২, এন সিরিজের এন ৯০০, এন ৯৭ প্রভৃতি। নকিয়া সহ অন্যান্য ব্রান্ডের আরো স্মার্টফোন ভবিষ্যতে বাজারে আসছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় কি জানেন, স্মার্টফোনে বাংলা লেখাতো দূরের কথা বাংলা দেখার ব্যবস্থাও নেই। নকিয়ার স্মার্টফোন তৈরি হয় সিমবিয়ান অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করে। এই অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা লেখা ও দেখার জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। তবে নকিয়া ৯ কী সম্বলিত জাভা সমর্থিত ফোনে ইতোমধ্যে বাংলা ভাষার প্রবেশ ঘটিয়েছে। টি৯ ব্যবহার করেও লেখার ব্যবস্থার করা হয়েছে। তাই স্মার্টফোনে বাংলা প্রবেশ করানোও তাদের জন্য খুব কঠিন হবে বলে মনে হয় না। শুনেছি আইফোনে বাংলা লেখা যায় না, কিন্তু ইউনিকোড কোডিং লেখা বাংলা দেখা যায় তবে সঠিকভাবে দেখায় না।

জাতি হিসেবে আমরা সব দিকে দিয়েই পিছিয়ে, এখানেও তাই। অনেক আগেই যেমন কম্পিউটারে বাংলা কীবোর্ডের ইস্যুটি মীমাংসা করে ফেলা উচিত ছিলো, সেই সাথে ঐ কীবোর্ড কে ভিত্তি করে স্মার্টফোনেও বাংলা দেখা ও লেখার ভিত্তি কি হবে তা নির্ধারণ করা উচিত ছিলো। তাই আজকের বিজয় বা ইউনিজয় যাই বলি না কেন, এটিকে উন্মুক্ত করে দেয়া হলে এটিই হতে পারে কম্পিউটার সহ স্মার্টফোনে বাংলা লেখার কমন প্লাটফর্ম। আমরা কি পারবো না এমন একটি কমন প্লাটফর্ম তৈরি করতে, সারা দুনিয়ার বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য না হোক অন্ততঃ বাংলাদেশীদের জন্য?